x 
Empty Product
Tuesday, 29 March 2016 07:08

আম নিয়ে নিষেধাজ্ঞাঃ আতঙ্কে আম ব্যাবসায়ীরা

Written by 
Rate this item
(0 votes)

ঋতুরাজ বসন্তের শুরুতেই আম্র-মুকুলের গন্ধে সুশোভিত হয়ে উঠেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর বাগানগুলো। মুকুল ভালো আসায় এবারও ভালো ফলনের আশায় বুক বাঁধছেন চাষিরা। তবে অগ্রিম বাগান কেনাবেচা আগের তুলনায় নিতান্তই কম। আমচাষি ও বিপণন-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বছর স্থানীয় প্রশাসনের বেঁধে দেওয়া সময়ের আগে আমপাড়ার নিষেধাজ্ঞা ও ফরমালিন আতঙ্কে এবার অগ্রিম বাগান বেচাকেনা কম হচ্ছে। রাজশাহীতে কোনো বাগানই এ পর্যন্ত বিক্রি হয়নি। অথচ প্রতিবছর এ সময় আমগাছের পাতা, মুকুল ও গুটি দেখে একেকটি আমবাগান তিন থেকে চারবার বেচাকেনা হতো। চাষিরা আশা করছেন, প্রশাসন গত বছরের সিদ্ধান্ত এবার পরিবর্তন করলে হাসি ফুটবে তাদের মুখে। পাশাপাশি পোষানো যাবে গতবারের লোকসান।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্র জানায়, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৩২ হাজার ২৪০ হেক্টর জমিতে আমের বাগান রয়েছে। এতে ২৫ লাখেরও অধিক আমগাছ রয়েছে। গত দুই বছরে দুই হাজারের মতো নতুন বাগান সৃষ্টি করা হয়েছে। এ বছর আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা এখনো নির্ধারিত হয়নি। গুটি আসার পর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হবে। গতবছর আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ৫০ হাজার টন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাজদার রহমান জানান, এ বছর অফ-ইয়ার হওয়া সত্ত্বেও আমের বাগানগুলো ছেয়ে গেছে মুকুলে-মুকুলে। পাঁচ উপজেলার ২৪ হাজার ৪৬০ হেক্টর জমিতে ১৮ লাখ ৫৮ হাজার ৭৭০টি গাছ রয়েছে। এবার ২ লাখ ৫০ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। এখন প্রতিটি বাগানে মুকুল যাতে ছত্রাকজাতীয় রোগে আক্রান্ত না হয়, সে জন্য আমচাষিরা কীটনাশক স্প্রে করে পরিচর্যায় ব্যস্ত।

দেশের সিংহভাগ আম চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় উৎপাদিত হয়। কিন্তু ২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিরোধী দলের হরতাল, ২০১৫ সালে টানা অবরোধ-হরতালের কারণে ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়েন। বেশি আম উৎপাদনকারী এলাকা শিবগঞ্জ ও কানসাটে ট্রাকে পেট্রলবোমা ছুড়ে একাধিক চালক ও হেলপারসহ ট্রাক পোড়ানোর ঘটনায় জেলার বাইরের আম বেপারিরা কম আসেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।

গত বছর চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহীর চারঘাট ও বাঘায় ১৫ মে থেকে ৫ জুন পর্যন্ত আমপাড়া ও বিক্রি নিষিদ্ধ করেছিল স্থানীয় প্রশাসন। ক্ষতিকারক কেমিক্যালের সাহায্যে কাঁচা আম পাকিয়ে তাতে ফরমালিন মিশিয়ে বাজারজাত করার অভিযোগে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। নিষেধাজ্ঞার এ ২২ দিন ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। ফলে কোনো বাগান মালিক কিংবা ব্যবসায়ী বাগান থেকে যথাসময়ে আম নামাতে পারেনি। এতে আগাম জাতের অনেক বাগানের আমই নষ্ট হয়েছে বলে অভিযোগ বাগান মালিকদের।

সম্প্রতি বাঘা-চারঘাটের সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম রাজশাহীর আম উৎপাদনকারী, ব্যবসায়ী ও সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সেই সভায় গত বছর বাঘা-চারঘাটে আমে ক্ষতিকর কেমিক্যাল মেশানোর যে অভিযোগে ২২ দিন আমপাড়া নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, সে অভিযোগ পুরোপুরি সঠিক নয় বলে ব্যবসায়ীরা জানান। প্রতিমন্ত্রীও বলেছেন, রাজশাহীবাসী আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন হয়েছেন।

আম ব্যবসায়ীদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রতি আম মৌসুমে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয় এবং ছয় মাসে দুই লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়। আর বাগান মালিকরা তাদের বিক্রীত আমবাগানের টাকা দিয়ে সংসারসহ বাড়তি খরচ করে থাকেন। জেলার সর্ববৃহৎ আমের বাজার কানসাট আম ব্যবসায়ী সমিতি, ভোলাহাট আম ফাউন্ডেশন, চেম্বার অব কমার্স, ম্যাংগো প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশন চলতি বছরে আম ভাঙার সময় বেঁধে দেওয়া, প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা ও প্রশাসনের অহেতুক হয়রানি বন্ধে বিভিন্ন ফোরামে জোরালো দাবি তুলছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জানান, প্রাকৃতিকভাবে আম পেকে থাকে। কিন্তু গতবার জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পোক্ত আম পাড়ার সময় বেঁধে দেওয়ায় অনেক চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হন। এ বছর এ সিদ্ধান্তটি বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করার আশ্বাস দেন তিনি।

নবাগত জেলা প্রশাসক মো. জাহিদুল ইসলাম জনান, জেলার প্রধান অর্থকরী ফসল আম। এ আম নিয়ে অনেকেই গত বছর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। তাই এবার জেলা আম পরীবিক্ষণ কমিটির সামনের সভায় ব্যবসায়ীরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেদিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ভোলাহাট আম ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হক চুটু বলেন, এবারও আম ভাঙার সময় বেঁধে দেওয়া হলে ব্যবসায়ী ও আমচাষিসহ সবাইকে নিয়ে গণঅন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বারের সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, এ জেলার সুমিষ্ট আম নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। চলতি বছর যাতে চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেজন্য তাদের পক্ষ থেকে কৃষিমন্ত্রী, এফবিসিসিআইসহ বিভিন্ন ফোরামে যোগাযোগ শুরু করেছেন।

ম্যাংগো প্রডিউসার অ্যাসোসিয়শনের সভাপতি মনিরুল ইসলাম বলেন, গত বছরের আম মৌসুমে জেলা প্রশাসনের একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালালেও কোথাও ফরমালিন বা কার্বাইড মিশ্রিত আম জব্দ করতে পারেনি।

কানসাট আম আড়তদার ব্যবসায়ী সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজী এমদাদুল হক জানান, প্রতিবছর এ সময় বাগান দুই থেকে তিনবার হাত বদল হয়ে থাকলেও এখনো একবারও বিক্রি না হওয়ায় বাগান মালিকরা চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।

নবাবগঞ্জ আম ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. সেরাজুল ইসলাম জানান, এ জেলার অহঙ্কার হচ্ছে আম। এখানকার চাষিরা বরাবরই আমে ফরমালিন কিংবা কার্বাইড মেশান না। তারা সৎভাবে যুগযুগ ধরে আম ব্যবসা করে আসছে। অথচ একটি মহলের হঠকারী সিদ্ধান্তের কারণে গত বছর প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয় আমচাষিদের। একই কারণে এবারও অধিকাংশ আমবাগান বেচাকেনা হয়নি।

রাজশাহী ফল গবেষণাকেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. আলিম উদ্দিন জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার গাছে খুব একটা কীটনাশক প্রয়োগের প্রয়োজন নেই। তবে ছত্রাকজনিত রোগেও আমের মুকুল-ফুল-গুটি আক্রান্ত হতে পারে।

রাজশাহী মহানগরীর উপকণ্ঠ রায়পাড়া এলাকার আমচাষি কামাল হোসেন জানান, এ বছরের আবহাওয়া আমের জন্য অনুকূলে রয়েছে। গত বছরের চেয়ে টানা শীত ও কুয়াশার তীব্রতা এ বছর অনেক কম।

চারঘাট উপজেলার আমচাষি ও ব্যবসায়ী মো. শওকত আলী বুলবুল জানান, আমে ফরমালিনসহ অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থ মেশানোর যে প্রচার চালিয়ে আমপাড়া নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তা সঠিক ছিল না। এ ধরনের প্রচারণার ফলে এ বছর রাজশাহীর কোনো আমবাগানই এ পর্যন্ত অগ্রিম বিক্রি হয়নি। এবার যাতে এমন প্রচারণা কেউ চালিয়ে রাজশাহীর আমশিল্পকে ধ্বংস করতে না পারে, সেজন্য প্রশাসনসহ সবার সহযোগিতা কামনা করেন এ ব্যবসায়ী।

রাজশাহী ফল গবেষণাকেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. আলিম উদ্দিন জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার গাছে খুব একটা কীটনাশক প্রয়োগের প্রয়োজন নেই। তবে ছত্রাকজনিত রোগেও আমের মুকুল-ফুল-গুটি আক্রান্ত হতে পারে।

রাজশাহী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মেসবাহ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, গত বছর অসাধু আম ব্যবসায়ীদের তৎপরতা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। এবছর মাত্র আমের মুকুল এসেছে। তারপরও যাতে আমে কেউ ফরমালিন মিশিয়ে ব্যবসা করতে না পারে, সে ব্যাপারে প্রশাসন সচেষ্ট থাকবে। সৎ ব্যবসায়ীদের বিষয়টিও গুরুত্ব সহকারে দেখা হবে।

Read 3796 times

Leave a comment

Make sure you enter the (*) required information where indicated. HTML code is not allowed.