x 
Empty Product
Thursday, 22 August 2013 15:29

আমের মতো এমন মজাদার ফল আর আছে নাকি!

Written by 
Rate this item
(0 votes)

আম নিয়ে অনেক গল্প-গাথা ছড়িয়ে আছে আমাদের দেশে। তবে গল্পের চেয়েও বেশি মজা আম খেতে। আমগাছঅলা মামাবাড়ি যাদের আছে, তাদের তো দারুণ মজা। গরমের ছুটিতে মামাবাড়ি গিয়ে আম কুড়ানোর মজাই অন্য রকম। বুড়ো রবীন্দ্রনাথও ভুলতে পারেননি সে কথা-
 সেই মনে পড়ে জ্যৈষ্ঠের ঝড়ে রাত্রে নাহিক ঘুম-
 অতি ভোরে উঠি তাড়াতাড়ি ছুটি আম কুড়াবার ধুম;
 আম কুড়ানোর এই মজা দুনিয়ার আর কোথায় আছে? যদিও এখন দুনিয়ার অনেক দেশেই আম ছড়িয়ে পড়েছে। ছড়িয়েছে এই উপমহাদেশ থেকেই। এ অঞ্চলে আমের বয়স চার থেকে ছয় হাজার বছর। রামায়ণ ও মহাভারতে 'আম্রকানন' ও 'আম্রকুঞ্জ' শব্দ দুটো রয়েছে। রামায়ণ-মহাভারত রচিত হয় খ্রিস্টের জন্মের চার শ থেকে পাঁচ শ বছর আগে। খ্রিস্টপূর্ব ৩২৭ অব্দে সিন্ধু উপত্যকায় এসেছিলেন আলেকজান্ডার। এখানকার আমে মুগ্ধ হয়েছিলেন তিনি। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা আমের চারা নিয়ে যান মালয় উপদ্বীপ, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও মাদাগাস্কারে। দশম শতকে পারস্যের বণিকদের হাত ধরে আম যায় মধ্য এশিয়ায়। পর্তুগিজরা ভারতে আসে পনের শতকের দিকে। তাদের মাধ্যমেই দক্ষিণ আমেরিকা আর পশ্চিম আফ্রিকায় আম ছড়িয়ে পড়ে। এখন দুনিয়ার প্রায় সব উষ্ণ অঞ্চলে আমের আবাদ হয়। বিশেষ করে ব্রাজিল, ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর মেক্সিকোয়।
 সংস্কৃতে টককে বলা হয় অম্ল বা অম্র। সেখান থেকে আম্র হয়ে আম। ওড়িয়া ভাষায় 'আঁব অ', মধ্যপ্রদেশে আঁবা, আমা, রাজস্থানে আঁবা, গুজরাটে অম্বো, মারাঠিতে আম্বা আর পাঞ্জাবি ভাষায় আম্ব। ইংরেজি ম্যাংগো শব্দটির উৎপত্তি তামিল শব্দ ম্যানগাই বা ম্যানকে থেকে। পর্তুগিজরা বলত ম্যানগা। ইতালিয়ান ভাষায় ম্যানগা শব্দটি প্রথম যুক্ত হয় ১৫১০ সালে। আমেরিকায় আমের আমদানি ঘটে সতের শতকে। বরফ দিয়ে সংরক্ষণ করতে না পারায় আমেরিকার লোকজন আমের আচার বানিয়ে রাখত। ক্যাপসিকামের মতো দেখতে মিষ্টি মরিচ বেল পিপারকেও আচার বানিয়ে রাখত তারা। আচার বানিয়ে রাখা এসব ফলকে তারা বলত 'ম্যানগোস'। আঠার শতকে এই ম্যানগোস হয়ে গেল ম্যানগো।
 কত রকমের আম আছে দুনিয়ায়? আকার ও স্বাদভেদে হাজার রকমের। বাংলাদেশে আমের জন্য বিখ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী। সেরা নামের আমের মধ্যে রয়েছে ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, হিমসাগর, লক্ষ্মণভোগ, মোহনভোগ, রানিপসন্দ, বেগমপসন্দ, বাদশাপসন্দ। গবেষণাগারে উদ্ভাবিত উন্নত জাতের মজাদার আমের মধ্যে আছে বারি-১, বারি-২, বারি-৩, বারি-৪, আম্রপালি, মল্লিকা এবং দিনাজপুরের সূর্যপুরী। আর ভারতের সেরা আমের মধ্যে আছে আলফাঁসো, নীলম, বাঙ্গানপল্লী, মালগোরা, সুবর্ণরেখা, চোষা, দশেরি, ল্যাংড়া, গুলাবখাস, বোম্বাই ইত্যাদি। আর দুই দেশ মিলে বাহারি নামের আম আছে কয়েক শ। বাদশাহি, আলমশাহি, বৃন্দাবনি, দিলশাদ, কোহিনূর, কোহেতুর, ওয়াবজান, ফেরদৌস পসন্দ, সুলতান পসন্দ, ক্ষীরসাপাতি, জাফরান, শ্রাবণী, ভাদুরিয়া, বিসমনি, ভরত, বিড়া, ভোজ, বাবুই ঝাঁকি, চম্পা, চকচকি, দুধসর, দুধকুমার, দ্বারিকা, দুধভোগ, আক্কেল গরম, ডায়মন্ড, নীলম, দোকশলা, বারোমাসি, মিছরিভোগ, তোতাপুরি, কপটভাঙ্গা, হাতিঝুল, গৌরজিৎ আরো কত কী! সেগুলোর দেখা হয়তো কালেভদ্রে মেলে। কিন্তু নামের বাহার তো আছে! দুনিয়ায় এত নাম আর জাতের ফল দ্বিতীয়টি নেই।
 সবচেয়ে বড় জাতের আম ফজলি। ফজলির পূর্বনাম ছিল 'ফকিরভোগ'। ফকিরভোগ থেকে ফজলি হওয়ার পেছনে রয়েছে মজার এক গল্প। ভারতে তখন ব্রিটিশ শাসন। ভারতের মালদহ জেলার এক প্রাচীন কুঠিতে বাস করতেন ফজলি বিবি নামে এক বুড়ি। তাঁর বাড়ির আঙিনায় ছিল একটি আমগাছ। গাছটির বেশ যত্ন নিতেন বুড়ি। বড় বড় আর প্রচুর আম ধরত গাছে। খেতেও ছিল সুস্বাদু। ওই এলাকার নির্জনবাসী ফকির-সন্ন্যাসীদের এই আম দিয়ে আপ্যায়ন করতেন ফজলি বিবি। সে কারণে আমের নাম 'ফকিরভোগ'। একবার অবকাশ যাপনের জন্য মালদহ জেলার কালেক্টর র‌্যাভেনশ সাহেব আস্তানা গেড়েছিলেন ফজলি বিবির কুঠির কাছে। ফকিরভোগ আম নিয়ে সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে যান ফজলি বিবি। আম খেয়ে তো সাহেব মুগ্ধ। তখনই র‌্যাভেনশ সাহেব আমের নাম দিয়ে ফেলেন- ফজলি। সেই থেকে ফজলি আমের নাম মানুষের মুখে মুখে। ফজলি বিবির বাড়ি থেকে সংগ্রহ করা হয় ফজলি আমের জাত। কিষণভোগ জাতের আমের নাম দেওয়া হয় মিথিলার জমিদার কৃষ্ণপ্রসাদ ঠাকুরের নামে। মিথিলা হচ্ছে বর্তমানে ভারতের বিহার রাজ্য। একইভাবে রাজা-বাদশা, নবাব-বেগম কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কারো নামে আমের নামকরণ করা হয়।
 আমের সঙ্গে আমবাগানের কথাও আসে। বাণিজ্যিকভাবে চাষের কারণেই তো আজ এত জাতের এত স্বাদের আম। বিহারের দ্বারভাঙ্গায় এক লাখ আমের চারা রোপণ করিয়েছিলেন মোগল সম্রাট আকবর। সে কারণে জায়গাটির নামই হয়ে গিয়েছিল লাখিবাগ। উপমহাদেশে এটাই উন্নত জাতের প্রথম আমবাগান। এদিকে গুটিকয়েক বিশ্বাসঘাতকের কারণে পলাশীর আমবাগানে ইংরেজদের কাছে যুদ্ধে হেরে গিয়েছিলেন বাংলা, বিহার, ওড়িশার নবাব সিরাজদ্দৌলা। আবার মেহেরপুরের আমবাগানেই গঠিত হয়েছিল প্রথম বাংলাদেশের সরকার। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি আমের উৎপাদন হয় ভারতে। এরপর চীন, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান, মেক্সিকো, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, বাংলাদেশ।
 দুনিয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় ফল নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র-কানাডায় জনপ্রিয় ফলের তালিকায় আম বা কাঁঠাল থাকার কথা না। তবে আম উত্তর আমেরিকায় জন্মে। অবশ্য ওদের আম আর আমাদের আমের স্বাদের মধ্যে রয়েছে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। আসলে যে কোনো ফলের রয়েছে নিজস্ব পরিবেশ ও আবহাওয়া। আম এ উপমহাদেশের ফল। কাজেই এখানকার আমের স্বাদ দুনিয়ার সেরা। তবে এ উপমহাদেশ থেকে প্রচুর আম রপ্তানি করা হয় পশ্চিমা দেশগুলোতে। আর শীতপ্রধান দেশের মানুষও বুঝতে পেরেছে, এখানকার আমের স্বাদ কী! উৎপাদন হিসাব করলে দুনিয়ার জনপ্রিয় ফলের তালিকায় পাঁচ নম্বরে রয়েছে আম, সাড়ে তিন কোটি টন। ফল হিসেবে দুনিয়াজুড়ে আমের মতো এত ব্যাপকভাবে আর কোনো ফল ছড়িয়ে পড়তে পারেনি। স্বাদেও আমের ধারেকাছে নেই কোনো ফল। এ জন্যই আমের নাম 'দ্য কিং অব ফ্রুটস'।
 গরমের এই ছুটিতে মামাবাড়িতে যাও বা না যাও, আম তো খেতে পারো। আর যারা মামাবাড়ি যাও তাদের জন্য একটা ধাঁধা-
 'নানার বাগানে আম পড়ল একটা, শুনল দুজন। যে দুজন শুনল সে দুজন গেল না। গেল অন্য দুজন। যে দুজন গেল সে দুজন ধরল না। ধরল অন্য দুজন। যে দুজন ধরল সে দুজন খেলো না। খেলো বত্রিশ জন। যে বত্রিশজন খেল তারা স্বাদ পেল না। কষ্ট করল অনেকে; কিন্তু স্বাদ পেল একজন।'
 আম খেতে খেতে ধাঁধাটা ভেদ করো তো দেখি। পাকা আম খেতে খেতেই না হয় জবাবটা দাও। কারণ আম খেলে কিন্তু বুদ্ধিও বাড়ে। দেখি তোমার বুদ্ধি কেমন বাড়ল। যদি কঠিন মনে হয়, তবে বলেই দিচ্ছি। নানার বাগানে আম পড়ার শব্দ পেল দুই কান। কিন্তু আম আনতে ছুটে গেল দুই পা। আর আম তুলল দুই হাত। ওদিকে খেল বত্রিশ দাঁত। কিন্তু স্বাদ পেল কে? জিহ্বা।

Read 3256 times Last modified on Sunday, 01 December 2013 10:21

Leave a comment

Make sure you enter the (*) required information where indicated. HTML code is not allowed.