x 
Empty Product
Monday, 10 June 2013 06:56

মৌসুমী ফল আম

Written by 
Rate this item
(0 votes)

আবহমান বাংলার ফল-ফসলের তালিকায় আম অতি পরিচিত সহজলভ্য একটি ফল। বাংলার উর্বর জমিন এবং উষ্ণ-আর্দ্র আবহাওয়া ফল-ফসল উৎপাদনের উপযোগী বলেই বিচিত্র স্বাদ, রঙ ও আকারের ফল-ফসল এখানে ফলে। ষড়ঋতুর এই দেশে বারোমাসই বলতে গেলে ফল পাওয়া যায়। কথায় আছে-বারো মাসে বারো ফল না-খাইলে যায় রসাতল। বাইরে থেকে দামি ফল ফসল আসে- লোকজন সমাদরও করে। কিন্তু দেশি ফলের স্বাদ এবং আবেদন আলাদা। আঙুর বিদেশি, স্বাদও আছে। কিন্তু আমের সঙ্গে শুধু রসনারই সম্পর্ক নয়-স্মৃতিরও আস্বাদন রয়েছে। তাই দেশি ফল-ফসলের সঙ্গে আমরা নাড়ির বন্ধন অনুভব করি। শাশ্বত বাংলার ফল-ফসলের সংখ্যা অন্য কোনো দেশের চেয়ে কম নয়। ছড়ার ছন্দে শোনা যাক কয়েকটি ফলের নাম- আম, জাম, আতা, লেবু, নারিকেল, কলা, লিচু, বেল, আনারস, কাঁঠাল, কমলা। ভাষান্তরে- আম জাম আতা লেবু জাম্বুরা কাঁঠাল কমলা লিচু বেল আনারস তাল ফুটি খিরাই আমড়া। তালিকায়, আমই প্রথম। বর্ণ শিক্ষায় আ-তে আম উচ্চারণ করে এ দেশের শিশুর প্রথম পরিচয় ঘটে আমের সঙ্গে। হয়তো তারও আগে পাড়ার শিশুদের

 অথবা ঘরের ভাই-বোনদের সঙ্গে বাঙালি শিশুটি বৈশাখি বাতাসে যায় আম কুড়াতে। ‘ঝড়ের দিনে মামার দেশে আম কুড়াতে সুখ’-এই সুখ শুধু পদ্যবন্ধে নয় বরং বাস্তবেও আছে। গ্রামবাংলার প্রতিটি বাড়িতে থাকে অনেকগুলো আম-কাঠালের গাছ। এ যুগে বৃক্ষ নিধনের পরও বাংলার গ্রামে গ্রামে যে ফলের গাছটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে সেটি হচ্ছে আমগাছ। আমের বোল আসে, গুটি হয়, বাতাসে ঝরে পড়ে কাঁচা আম। শিশুরা ঝড়ের দিনে ঝড় থামতেই হই হই করে নেমে পড়ে আম কুড়াতে। সে কী উল্লাস এবং উত্তেজনা। এই যে আম কুড়ানোর সুখ স্মৃতি-তা বর্তমান শহরবাসী যে কোনো প্রৌঢ় বা বৃদ্ধকে মুহুর্তে নিয়ে যায় শৈশবের উঠোনে। আম, আনারস, কাঁঠাল। এই তিনটি ফল বাংলার গ্রীষ্মকালীন একান্ত এবং অত্যন্ত সমাদৃত ফল। সামাজিক অনেক রসুম ও রেওয়াজ এই ফলগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। গ্রীষ্মকালে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে পাঠানো হয় আম-কাঁঠাল। মেয়ের জামাইকে দাওয়াত দেয়া হয় আম-কাঁঠাল খাওয়ার। বর্তমান যুগেও এ রেওয়াজ টিকে আছে। এদেশে স্কুল কলেজগুলোতে শ্রীষ্মকালীন ছুটিকে বলা হয় আম-কাঁঠালি বন্ধ। বুঝতে কষ্ট হয় না, আম-কাঁঠাল আমাদের সমাজ জীবনে কতটা স্থান জুড়ে আছে। রাজনৈতিক দৃষ্টিতেও আম আমাদের জড়িয়ে আছে। ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে পলাশির আম বাগানে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হলো। ‘বণিকের মানদন্ড দেখা দিল রাজদন্ড রূপে’। আবার ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে কুষ্টিয়ার মেহেরপুরে আম বাগানে গঠিত হলো বাংলাদেশের প্রথম সরকার। শুধু তাই না, জাতীয় সংগীতেও দেখুন- ওমা ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে.......... হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে আম গুরুত্বপূর্ণ বৃক্ষ। এমন হিন্দুবাড়ি পাওয়া কঠিন, যে বাড়িতে দু’চারটি আমগাছ নেই। শুধু ফলের জন্য নয়; মৃত্যুর পরও আম গাছের প্রয়োজন বলেই হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে এর গুরুত্ব অপরিসীম। মৃতের সৎকার বা দাহ করতে আমকাঠ নিদেনপক্ষে আমের ডালপালা আবশ্যক। অন্য কাঠে দাহ করলেও আমকাঠ লাগবে। সরস্বতি পূজার প্রধান উপচার আমের মুকুল। চৈত্র সংক্রান্তির আগে কাঁচা পাকা কোনো আমই হিন্দুরা খান না। এটি বহু প্রাচীন প্রথা রূপে প্রচলিত। আমের সঙ্গে স্মৃতি আছে। সেই সঙ্গে সংস্কারও কম নয়। শৈশবে অনেকেই হয়তো পোকায় খাওয়া আম খেয়েছেন। লোকবিশ্বাস ছিল, পোকড়া আম খেলে তাড়াতাড়ি সাঁতার শেখা যায়। পাকা আম, কী সুন্দর রঙ। কোনটা হলুদাভ, কোনটা টকটকে লাল, কোনটা আবার সিঁদুরে। বাইরের দিকটা ঝকঝকে অক্ষত কিন্তু আমটা ছুরি অথবা বটি দা’য় কাটতেই বের হয়ে গেল আস্ত জীবন্ত কালচে রঙের ছোট পোকা। এ নিয়ে শিশু বয়সে বিস্ময়ের ঘোর লাগেনি এমন লোক পাওয়া যাবে না। আমের বোল এলে চোখে পড়ে সকলেরই। লোকবিশ্বাস হচ্ছে, আমের ফসল ভালো হলে ঝড় তুফান বেশি হবে। লোক শাস্ত্রে বলে-আমে বান, তেঁতুলে ধান। হ্যাঁ, গান, ছড়া, কবিতা, সাহিত্যেও আমের স্থান রয়েছে। আমের মৌসুমে বিরহী গৃহবধূর মনের আকুতি ফুটে উঠছে এ দেশের লোকসাহিত্য গীতিকায়- জ্যৈষ্ঠ না মাসেরে বন্ধু গাছে পাকা আম আমার বন্ধু নাইরে দেশে কারে খাওয়াইতাম। আম খাইত কাঁঠাল খাইত খাইত গাইর দুধ সামনে বসাইয়া সাধুর দেখতাম চাঁদমুখ। জ্যৈষ্ঠ মাসেই মুলত আম-জামের ধুম পড়ে। এ মাসেই তাই বিরহিনীর বুকের যন্ত্রণা মোচড় দিয়ে ওঠে! আম পাকিল জাম পাকিল, পাকিল কাঁঠাল, আমার দেশের বন্ধু বিদেশ রইল বুকে দিয়া শাল। একটি লোক কথায় আম এসেছে এভাবে- পৌঁষে কুশি মাঝে বোল, ফাল্গুনে গুটি চোতে অাঁটি বোশেখে কাটিকুটি জ্যৈষ্ঠে দুধের বাটি আষাঢ়ে পুতে রাখি শ্রাবণে বাজাই বাঁশি। আমের একটি পৃথক ব্যঞ্জনা আছে। কবি ফররুখ আহমদের (১৯১৮-১৯৭৪) ছড়ায় সেই ব্যঞ্জনার আভাস পাওয়া যায়- ঝড় এলো এলো ঝড় আম পড় আম পড় কাঁচা আম ঢাসা আম টক টক মিষ্টি এই যা এলো বুঝি বৃষ্টি। আমের সঙ্গে প্রত্যেকের স্মৃতিময় শৈশব জড়ানো। যেমন কবি জসিম উদ্দীনের (১৯০৩-১৯৭৬) কবিতায়- ঝড়ের দিনে মামার দেশে আম কুড়াতে সুখ পাকা জামের মধুর রসে রঙিন করি মুখ। শৈশবে গুরুজনের চোখ ফাঁকি দিয়ে কচি টক আম পেড়ে নুন লঙ্কা দিয়ে খাবার স্বাদ হয়তো এখনো অনেকের মুখে লেগে আছে। রসুন, শুকনো ভাজা মরিচ সহযোগে পাতলা করে কাটা আমের চাটনি রসনায় লালা আনে। বাতাসে ঝরে পড়া কচি আম অথবা বোলের সঙ্গে ছোট গুঁড়া মাছের ঝোল মহিলাদের অতি প্রিয়। কচি আম কেটে শুকিয়ে আমশি করা হয়। গ্রীষ্মের দুপুরে জলে ভিজিয়ে হয় সুপেয় শরবত। আমের আচার এখন বাজারেও সুলভ মূল্যে পাওয়া যায়। গ্রামের সবচেয়ে মজাদার খাবার আমসত্ত্ব। পাকা মিষ্টি আম গুলিয়ে চেপ্টা ডালায় লেপ্টে দেওয়া হয় স্তরের পর স্তর। রোদে শুকিয়ে নিলে পুরু জাজিমের মতো বিশাল আম সত্ত্ব। সারা বছর সংরক্ষণ করা যায়। এর স্বাদ ভাষা দিয়ে বোঝানো দায়। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) কবিতায় হাত পাকাতে গিয়ে আম সত্ত্বের স্বাদ কী চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন- আমসত্ত্ব দুধে ফেলি তাহালে কদলী দলি সন্দেহ মাখিয়া দিয়া তাতে হাপুস হুপুস শব্দ চারিদিক নিস্তব্ধ পিঁপড়া কাঁদিয়া যায় পাতে। আমের বৈদিক নাম মাকন্দ! মূলত আম ভারতীয় একটি ফল। বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চলের আমের মান অত্যন্ত উঁচু। বাংলাদেশে আমের বিচিত্র স্বাদ, আকার ও রঙ ভেদে আমও আলাদা। রাজশাহী অঞ্চলের আমের কয়েকটি নাম হচ্ছে- গোপালভোগ, মালভোগ, লেংড়া, কইতরি, বউভোলানী, বিবিপছন্দ, সুন্দরী, কালুয়া, সিঁদুরকাটা প্রভৃতি। সুনীতি কুমার মন্ডলের তৈরি একটি নাম তালিকা থেকে কয়েকটি নাম উল্লেখ করা যাক-বৈশাখি, পাঞ্জাছন্দ, সরঙ্গাম, ফজলি, হিমসাগর, দাউদিয়া, চম্পা, সুরম্পা, ভবানী, কলাবতী প্রভৃতি। আমের স্বাদ যেমন আছে তেমন খাদ্য মূল্যও আছে। বাংলার জনগণের অতি প্রিয় সুস্বাদু ফল আম এখনো সর্বত্র প্রচুর জন্মায় তবে আমগাছের সংখ্যা কমে আসছে।

Read 4034 times

Leave a comment

Make sure you enter the (*) required information where indicated. HTML code is not allowed.