x 
Empty Product
Saturday, 15 January 2022 20:39

হাঁড়িভাঙ্গা আমে বদলে গেছে রংপুর

Written by 
Rate this item
(0 votes)

বিঃদ্রঃ এই আর্টিকেলটি আমাদের নিজস্ব না। অনলাইনে আম সেক্টরকে আরও বেশি প্রসারিত করার জন্য বিভিন্ন সোর্স থেকে গুরুত্বপুর্ন কন্টেন্টগুলো আমরা কপি করে প্রকাশ করে থাকি। যেহেতু এই নিউজটি একাধিক সাইটে প্রকাশ পেয়েছে, তাই এখানে আমরা সোর্স লিংক প্রকাশ করছি না।

বছরের পর বছর ধরে রংপুরে ধানসহ অন্যান্য ফসল উৎপাদন হয়ে আসছে। তবে ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় দিন দিন বেড়েছে হতাশা। এখন সেই হতাশার ছাপ কেটে গেছে। স্বাদে গন্ধে অতুলনীয় হাঁড়িভাঙ্গা আম বদলে দিয়েছে এখনকার চাষিদের পরিচয়। ধানচাষিরা এখন আমচাষি। প্রতি বছর আম চাষ করে লাখ লাখ টাকা আয় করে শুরু হয়েছে তাদের দিন বদলের গল্প। ভাগ্য বদলে গেছে হাজার হাজার আমচাষি ও কৃষকের। হাঁড়িভাঙ্গা আম যেন রংপুরের অর্থনীতির জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে।

বিষমুক্ত ও অতি সুমিষ্ট আশঁহীন হাঁড়িভাঙ্গা আমের চাহিদা বাড়ছে দিন দিন। কয়েক বছর ধরে ফলন ভালো হওয়ায় বেড়ে চলেছে আম উৎপাদনের পরিধিও। রংপুর সদর, মিঠাপুকুর ও বদরগঞ্জ উপজেলার বিস্তৃত এলাকার ফসলি জমি, বাগানসহ উঁচু-নিচু ‍ও পরিত্যক্ত জমিতে চাষ হচ্ছে এই আম।

রংপুর সদর এলাকা ছেড়ে মিঠাপুকুরের খোড়াগাছ ইউনিয়নের পদাগঞ্জে যেতে দেখা মিলবে সারি সারি গাছ। রাস্তার দুপাশে যেন হাঁড়িভাঙ্গা আম গাছের সবুজ বিপ্লব। ধানসহ বিভিন্ন ফসলি জমির আইলে আইলে লাগানো হয়েছে আমের গাছ। বাদ পড়েনি বসতবাড়ির পরিত্যক্ত জায়গা, পুকুরপাড়, বাড়ির উঠান। এখন গাছে গাছে দোল খাচ্ছে অপরিপক্ক হাঁড়িভাঙ্গা। একই চিত্র মিঠাপুকুরের আখিরাহাট, মাঠেরহাট, বদরগঞ্জের গোপালপুর, নাগেরহাট, সর্দারপাড়া, রংপুর সদরের সদ্যপুষ্করনী ইউনিয়নের কাঁটাবাড়ি, পালিচড়া এলাকাতেও।

গত কয়েক বছরের মতো এবারও হাঁড়িভাঙ্গার বাম্পার ফলন হয়েছে। যদিও হাঁড়িভাঙ্গার দাম পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় চাষি এবং ব্যবসায়ীরা। প্রতি বছর কম বেশি শত কোটি টাকার ওপরে বিক্রি হয় হাঁড়িভাঙ্গা আম। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি না হওয়ায় দুশ্চিন্তায় আছেন চাষিরা। মহামারি করোনার কারণে সঠিক সময়ে আম বাজারজাত ও পরিবহন সুবিধা বাড়ানো না গেলে রয়েছে লোকসানেরও আশঙ্কা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, হাঁড়িভাঙ্গার রাজধানীখ্যাত পদাগঞ্জের যাতায়াত ব্যবস্থা এখনো নাজুক। আম বিক্রির মৌসুমে একটু বৃষ্টি হলেই হাট-বাজারে কাঁদা মাড়িয়ে যেতে হয়। চাষি, ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের জন্য পদাগঞ্জ হাটে নেই আম বিক্রির শেড। মোটা অংকের লেনদেনে নেই ব্যাংক ও বুথ। জেলার বাইরে থেকে আসা ব্যবসায়ীদের থাকার জন্য আবাসিক হোটেলের ব্যবস্থাও নেই। দীর্ঘদিনেও গড়ে উঠেনি হাড়িভাঙ্গা আম সংরক্ষণ হিমাগার।

কৃষি বিভাগ ও আমচাষিরা বলছেন, জুনের শেষ সপ্তাহে বাজারে মিলবে পরিপক্ক হাঁড়িভাঙ্গা আম। এর আগে বাজারে হাঁড়িভাঙ্গা আম পাওয়া গেলেও তা অপরিপক্ক হবে। হাঁড়িভাঙ্গার প্রকৃত স্বাদ পেতে জুনের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে হবে। বর্তমানে বাগানগুলোতে আমের পরিচর্যা চলছে। নির্ধারিত সময়ে আম বাগান মালিক ও চাষিরা গাছ থেকে হাঁড়িভাঙ্গা আম পাড়তে পারবেন। এরপর থেকে শুরু হবে বাজারজাত।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর জানিয়েছে, এবার রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার আখিরাহাট, পদগঞ্জ, মাঠেরহাট, বদরগঞ্জ উপজেলার গোপালপুরসহ বেশি কিছু এলাকায় প্রায় ৩ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে সব জাতের আমের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৮৬৫ হেক্টর জমিতে রয়েছে হাঁড়িভাঙ্গা আম। জেলায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৩ হাজার ৮৩৫ মেট্রিক টন। এর মধ্যে হাঁড়িভাঙ্গা আমের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৭ হাজার ৯২৫ মেট্রিক টন আম।

জেলার মধ্যে বদরগঞ্জে সবচেয়ে বেশি ৪০০ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। এ ছাড়াও রংপুর মহানগর এলাকায় ২৫ হেক্টর, সদর উপজেলায় ৬০ হেক্টর, কাউনিয়ায় ১০ হেক্টর, গঙ্গাচড়ায় ৩৫ হেক্টর, মিঠাপুকুরে ১ হাজার ২৫০ হেক্টর, পীরগঞ্জে ৫০ হেক্টর, পীরগাছায় ৫ হেক্টর ও তারাগঞ্জ উপজেলায় ১৫ হেক্টর জমিতে আম বাগান রয়েছে।

হাঁড়িভাঙা আমের গোড়াপত্তন করেছিলেন খোড়াগাছ ইউনিয়নের তেকানি গ্রামের নফল উদ্দিন পাইকার নামে এক বৃক্ষবিলাসী মানুষ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগের বছর ১৯৭০ সালে নফল উদ্দিন ১২০ বছর বয়সে মারা যান। এখন তার লাগানো হাঁড়িভাঙ্গা গাছটির বয়স ৬৮ বছর। মাতৃগাছটির সংরক্ষণের দাবি জানান নফল উদ্দিন পাইকারের ছেলে আমজাদ হোসেন পাইকার।

একই ইউনিয়নের তেকানি গ্রামের আমচাষি শাহ্জাহান মিয়া। বছর দশেক আগেও তিনি শুধু ধান, ভুট্টা আর পাটচাষ করতেন। কিন্তু গ্রামে হাঁড়িভাঙ্গা আম গাছের বাগানের পর বাগান দেখে তিনিও ৪৮ শতক জমিতে আমের বাগান গড়ে তোলেন।

অর্থনৈতিকভাবে লাভবান এই আমচাষি ঢাকা পোস্টকে বলেন,‘আল্লায় দেচে এবার আম ভালো হইচে। গাছোত আম দেকে মনে শান্তি পাই। আল্লাহ রহম করলে আম ব্যাচে মাইনসের ঋণ পরিশোধ করিম। হাঁড়িভাঙ্গা আম খুব সুস্বাদু মিষ্টি। চাহিদাও অনেক বেশি। গত বছর করোনার কারণে খুব বেশি লাভ হয় নাই। এবার আশা করি ভালোয় বেচাবিক্রি হইবে।’

ওই ইউনিয়নের রুপসী আনন্দ বাজার এলাকায় হাসান মিয়া ও সোহাগের মতো আরও অনেকেরই আম বাগান জুড়ে গাছে গাছে দোল খাচ্ছে হাজার হাজার হাঁড়িভাঙ্গা। এই আম যেন তাদের মনে আনন্দ উচ্ছ্বাসের ঢেউ ছড়াচ্ছে। তারা স্বপ্ন দেখছেন হাঁড়িভাঙ্গাকে ঘিরে এবার রংপুর অঞ্চলে দেড়শ কোটি টাকার বেশি বিকিকিনি হবে।

আখিরাহাট এলাকার আমচাষি নজরুল ইসলাম বলেন, ‘কতাত কয় না অভাবোত স্বভাব নষ্ট। আগোত উপায় না থাকাতে মাইনসে খালি ধান আবাদ করছে। এ্যলা হামরা ধান আবাদ করি খাওয়ার জনতে, আর আম করছি লাভের জনতে। খালি হামার গ্রামোতে নোয়ায় এ্যলা হাঁড়িভাঙ্গা আম চাবালুয়া, শ্যামপুর, হেলেঞ্চ, পাইকারেরহাট, জারুল্লাপুর, খোঁড়াগাছ, গোপালপুর, সরদারপাড়া, লালপুর, পদাগঞ্জ, তেকানি, দুর্গাপুরসহ মেলা কয়টা গ্রামোত চাষ হওচে। গ্রামোত একটা বাড়িও খুঁজি পাওয়া যাবার নায় যে বাড়ির খুলিত হাঁড়িভাঙ্গার গাছ নাই।’

হাঁড়িভাঙা আমকে ঘিরে বেকারের সংখ্যাও কমেছে রংপুরসহ আশপাশের কয়েকটি উপজেলায়। বিশেষত মিঠাপুকুরের লালপুর, পদাগঞ্জ, তেকানিসহ আশপাশের গ্রামের বেকার যুবকরা এখন আম ব্যবসায় জড়িয়ে বেকারত্ব দূর করেছেন। অনেকে আবার উদ্যোক্তা হিসেবে হাড়িভাঙ্গার বাজার সম্প্রসারণ ও চাষাবাদ বাড়ানোর জন্য কাজ করছেন।
পড়ালেখা করে অনেক দিন ভাবছি কি করব। এখন আমি আমকে ঘিরেই স্বপ্ন দেখছি। প্রথমে পরীক্ষণমূলকভাবে আম চাষ শুরু করেছিলাম। লাভবান হওয়ার পর থেকে এখন বাণিজ্যিকভাবে হাঁড়িভাঙা আমের চাষাবাদ ও ব্যবসা করছি। নিজের পাশাপাশি এলাকার অন্যদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে চেষ্টাও করছি।
মেহেদী হাসান পলাশ, তরুণ উদ্যোক্তা ও আমচাষি

নির্বিঘ্নে আম বাজারজাত করতে দুর্যোগকালীন দুশ্চিন্তা তাড়াতে সরকারের কৃষি সম্প্রসারণ, কৃষি বিপণন ও পরিবহন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে যৌথ ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার দাবি জানান হাঁড়িভাঙ্গা আমের সম্প্রসারক আব্দুস সালাম সরকার।

আখিরাহাটের বাসিন্দা আব্দুস সালাম ১৯৯২ সাল থেকে হাঁড়িভাঙ্গা আমের চাষ করে আসছেন। শুধু চাষবাদ নয়, এই অঞ্চলের হাঁড়িভাঙ্গা সম্প্রসারণে তার অবদান অনস্বীকার্য। তার হাত ধরেই এ অঞ্চলের মানুষ এখন অন্যান্য ফসলের চেয়ে বেশি লাভের আশায় জেলার উঁচু-নিচু ‍ও পরিত্যক্ত জমিতে প্রতি বছর হাড়িভাঙ্গা আম চাষের দিকে ঝুঁকছেন।

আব্দুস সালাম সরকার ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘আমি প্রায় ৩০ বছর ধরে হাড়িভাঙ্গা আমের চাষ করছি। আমার দেখাদেখি এখন রংপুরে কয়েক লাখ হাঁড়িভাঙ্গা আমের গাছ রোপণ করেছে আমচাষিরা। আমার ২৫টির বেশি বাগান রয়েছে। এ রকম অনেকের আম বাগান রয়েছে। পুরো জেলায় এখান প্রতি বছর প্রচুর আম উৎপাদন হয়।

টেকসই অর্থনীতির জন্য আমি শুরু থেকেই হাড়িভাঙ্গা আমের সংরক্ষণের জন্য হিমাগার স্থাপন, আধুনিক আমচাষ পদ্ধতি বাস্তবায়ন, গবেষণা কেন্দ্র স্থাপনসহ হাড়িভাঙ্গাকে জিআই পণ্য হিসেবে ঘোষণার দাবি করে আসছিলাম। কিন্তু বিভিন্ন কারণে এই দাবি উপেক্ষিত হলেও আমের উৎপাদন ও বাগান সম্প্রসারণ থেমে নেই। সরকার একটু দৃষ্টি দিলেই হাড়িভাঙ্গাকে ঘিরেই এই অঞ্চলের অর্থনীতি আরও সচল হবে।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপপরিচালক কৃষিবিদ মাসুদুর রহমান সরকার ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘জেলায় এখন ব্যাপকভাবে হাঁড়িভাঙা আম চাষ হচ্ছে। খুব বেশি পরিশ্রম ও অর্থ বিনিয়োগ করতে না হওয়ায় মানুষ আমচাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। চাষি, ব্যবসায়ী ও বাগান মালিকদের কৃষি বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘রংপুরে এ বছর হাঁড়িভাঙা আম চাষ হয়েছে ১ হাজার ৮৬৫ হেক্টর জমিতে। দেশের অন্যান্য স্থানের আম শেষ হয়ে যাওয়ার পর হাঁড়িভাঙ্গা আম বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আসে। জুনের শেষ সপ্তাহ থেকে এই আম বাজারে আসবে। শুধু হাঁড়িভাঙ্গা আমই দেরি করে বাজারে আসে না, গৌরমুখি ও বারি-৪ জাতের আম আরও পরে পেকে থাকে। তবে হাড়িভাঙ্গা আমের মতো সেগুলোর বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি নেই।’

রংপুরের জেলা প্রশাসক আসিব আহসান বলেন, ‘হাঁড়িভাঙ্গা আমের বাজারজাত করতে যাতে কোনো ধরনের অসুবিধা না হয়, সেটি মনিটরিং করা হবে। বিশেষ করে পরিবহনে ব্যবসায়ীদের কোনো হয়রানির শিকার হতে না হয়, সেজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি সরকারি পরিবহন সুবিধার বিষয়টিও দেখা হবে।’

এদিকে রংপুর অঞ্চলে হাঁড়িভাঙ্গা আমের ফলন বেশি হলেও ফজলি, এছাহাক, ছাইবুদ্দিন, সাদা ল্যাংড়া, কালা ল্যাংড়া, কলিকাতা ল্যাংড়া, মিশ্রিভোগ, গোপালভোগ, আম্রপালি, সাদারুচিসহ আরও নানা প্রজাতির আম উৎপাদন হয়ে আসছে। এসব আমের ভিড়ে এখন সবচেয়ে বেশি চাহিদা হাড়িভাঙ্গার। একটি হাঁড়িভাঙ্গা আমের ওজন ২শ থেকে সাড়ে ৪শ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে।

Read 787 times

Leave a comment

Make sure you enter the (*) required information where indicated. HTML code is not allowed.