x 
Empty Product
Tuesday, 10 December 2019 10:07

একটি অর্গানিক আম বাগান

Written by 
Rate this item
(0 votes)

বাজারে যখন কার্বাইড, ফরমালিন আর কেমিকেলের ছড়াছড়ি তখন অর্গানিক আম নিয়ে রীতিমত যুদ্ধেই নেমেছেন একজন আইনজীবী। আর এ যুদ্ধ কোনো আইনী লড়াইয়ের মাধ্যমে নয়, বরং নিজস্ব ৪০ বিঘা জমিতে আম বাগান করে অর্গানিক আমের প্রতি আগ্রহী ক্রেতাদের মধ্যে সরবরাহের মাধ্যমে বিষমুক্ত আম খাওয়াবেন বলে প্রতিজ্ঞা করেছেন তিনি। ইতোমধ্যেই দিঘলিয়ার ‘উকিল সাহেবের আম বাগান’ নামে পরিচিত সবুজ উদ্যান দেশে বেশ পরিচিতি লাভ করেছে। অর্গানিক আম বাগানের মূল উদ্যোক্তা এডভোকেট শেখ শাহাদাত আলীর পাশে সার্বক্ষনিক রয়েছেন তার স্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রফেসর রওশন আকতার। যিনি সম্প্রতি খুলনা সরকারি মহিলা কলেজ থেকে অবসরগ্রহণ করে স্বামীর সাথে আম বাগানেই সময় দিচ্ছেন। স্বামী-স্ত্রী দু’জনে মিলে যে আম বাগানটির পরিচর্যা করছেন সেখানে মওসুমে রীতিমত দর্শনার্থীদের ভিড় জমে। এজন্য তারা সেখানে একটি পর্যটনকেন্দ্রও গড়ে তুলতে চাইছেন। রয়েছে একটি পিকনিক স্পটও। যেখানে ছোট্ট পরিসরে পিকনিক করা ছাড়াও বৃক্ষপ্রেমিক কিছু মানুষকে নিয়ে বিনোদনের সুযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি ওই আম বাগান পরিদর্শনকালে দেখা যায়, বিগত ২০দিন আগে থেকেই হিমসাগর আম পাড়া শুরু হয়েছে। দু’দিন আগে থেকে শুরু হয়েছে ল্যাংড়া আম পাড়া। বর্তমানে মল্লিকা ও আম্রপালী পাকা শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন এডভোকেট শেখ শাহাদাত আলী। এছাড়াও ৪০ বিঘার ওই আম বাগানে আছে ম্যাটাডোর(থাই), কাটিমোন ও পৌড়মতি আম।

সরাসরি ক্রেতারা গিয়ে যেমন ওই বাগান থেকে গাছপাকা আম কিনতে পারছেন তেমনি মোবাইল ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে অর্ডার নিয়েও আমগুলো পাঠানো হচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। সরাসরি বাগান থেকে আম কিনলে হিমসাগরের কেজি পড়ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকা করে এবং কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের অন্যান্য স্থানে পাঠাতে গিয়ে আমের কেজি পড়ে যাচ্ছে একশ’ থেকে ১২০টাকা পর্যন্ত।

এডভোকেট শাহাদাত আলী বলেন, যেহেতু এটি অর্গানিক আম এবং কোন প্রকার কেমিকেল ব্যবহার করা হচ্ছে না, সেহেতু এর উৎপাদন খরচ একটু বেশি পড়ছে।

পোকা দমনে সেক্স ফ্রেমন ট্যাব ছাড়াও তাইওয়ান থেকে আনা ইয়োলো কার্ড নামে এক প্রকার আঠা জাতীয় পেপার ব্যবহার করা হয়। যেগুলো অনেক উচ্চমূল্য পড়ছে বলে আমের মূল্যও বেশি পড়ে গেছে।

এছাড়া এবার ফনিসহ অন্যান্য কয়েকটি ঝড়ে বেশকিছু আম পড়ে গেছে। তার এবারের লক্ষ্যমাত্রা ছিল অন্তত: এক হাজার মন আম উৎপাদনের। কিন্তু কিছু ঝড়ে পড়ে যাওয়ায় সাত থেকে ৮শ’ মন হতে পারে। ৪০ বিঘা জমিতে সর্বমোট ৬শ’ আম গাছ রয়েছে ওই সবুজ উদ্যানে।

আম ছাড়াও প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ আমের চাড়া সরবরাহ করা হয় ওই বাগান থেকে। ওই বাগানটি নিছক একটি আম বাগানই নয়, বরং এখানে রয়েছে গবেষণার সুযোগ। সেই সাথে মার্কেটিং ও মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা হয়। এডভোকেট শাহাদাত আলীর পরামর্শ নিয়ে দিঘলিয়ার অনেকেই আম বাগান করে আজ স্বাবলম্বী হয়েছেন। এডভোকেট শাহাদাত আলী বিগত ৪০ বছর ধরে আম চাষ করছেন উল্লেখ করে বলেন, তার বাগানে কয়েকটি স্থানীয় জাতের আমগাছ ছিল অনেক বয়সের। যেগুলোকে তিনি জাতের আমে পরিণত করেছেন। এজন্য প্রথমে স্থানীয় জাতের গাছগুলোর ডাল কেটে দিয়ে পরে বর্ধিত অংশে জাতের আমের ডাল দিয়ে কলম বাধা হয়। যেসব গাছে এখন বিপুল পরিমাণ আম শোভা পাচ্ছে।

এডভোকেট শাহাদাৎ আলীর স্ত্রী অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রফেসর রওশন আকতার বলেন, ভাল আমগুলো বিক্রির পাশাপাশি বাতিল (সামান্য ছিলে যাওয়া) আমগুলো দিয়ে আমসত্ব তৈরি করা হয়। যা অনেক দিন সংরক্ষণ করে রাখা যায়।

দিঘলিয়া উপজেলার দেয়াড়া পূর্বপাড়ায় অবস্থিত ওই আম বাগানকে ঘিরে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তুলতেও নেয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। ইতোমধ্যে সেখানের পুকুরে আনা হয়েছে ছোট্ট প্লাষ্টিক বোর্ড। যেটি একদিকে যেমন পুকুর পাড়ের গাছের আম পাড়ার কাজে ব্যবহৃত হয় অপরদিকে পর্যটকদের পুকুর ভ্রমণেও কাজে লাগে।

হাতের স্পর্শ ছাড়া আম পাড়ার ব্যাপারেও প্রফেসর রওশন আকতার উদ্ভাবন করেছেন এক নতুন প্রযুক্তি। লম্বা লাঠির এক মাথায় নেট দিয়ে তার সাথে কাপড় মুড়িয়ে লম্বা করে নিচ পর্যন্ত নামিয়ে এমনভাবে আম পাড়া হবে যাতে আমটি কোনভাবেই মাটিতে পড়ে আঘাতপ্রাপ্ত না হয়। এভাবে আম নিয়ে নিত্যনতুন গবেষণা আর কৌশল আবিষ্কার করছেন দিঘলিয়ার এই দম্পতি।

দিঘলিয়ার সবুজ উদ্যান সম্পর্কে রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (আম গবেষণা) ড. মো. শরফ উদ্দিন বলেন, এক সময় মানুষ জানত শুধু রাজশাহীই আমের রাজধানী। কিন্তু খুলনার দিঘলিয়ার এডভোকেট শাহাদাত আলী প্রমাণ করলেন লবণাক্ত এলাকায়ও পরিকল্পিতভাবে বাগান করলে আম উৎপাদন করা সম্ভব। বিশেষ করে অর্গানিক আমের ক্ষেত্রে দিঘলিয়ার সবুজ উদ্যানটি হতে পারে দেশের জন্য একটি মডেল। তার মত একজন কৃষককে অনুসরণ করলে অন্যান্য কৃষকরাও সফল হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

দিঘলিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. হাফিজ আল-আসাদ বলেন, এমন একটি উদ্যোগকে সবারই সহযোগিতায় এগিয়ে আসা উচিত। কেননা, বিষমুক্ত আম উৎপাদনে এ ধরনের উদ্যোগই প্রয়োজন। তাছাড়া এমন একজন কৃষককে অনুসরণের মধ্যদিয়ে দেশে কৃষি বিপ্লব ঘটানো সম্ভব বলেও তিনি মনে করেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনার উপ-পরিচালক পংকজ কান্তি মজুমদার বলেন, আম হচ্ছে ফলের রাজা। এক সময় দেশে স্থানীয় জাতের আম ছিল। যার ফলন যেমন ছিল কম তেমনি মিষ্টিও কম ছিল। কিন্তু এখন বাজারে বিভিন্ন জাতের আম এসেছে। যার স্বাদ ও ঘ্রাণ যেমন বেশি তেমনি আকার-আকৃতিও বড়। সব মিলিয়ে বর্তমান যুগের সাথে তাল মিলিয়ে দিঘলিয়ার সবুজ উদ্যানটি গড়ে উঠেছে।

একটি পরিসংখ্যানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০১০ সালের পর থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সারাদেশে আমের ফলন প্রায় দ্বিগুন বেড়েছে। সেই সাথে আম খাওয়ার প্রতিও মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। এটি অবশ্যই একটি ভাল দিক। এক সময় কৃষি বিভাগই আম্রপালি চাষ শুরু করে। যা আজ দেশব্যাপী সমাদৃত। এখন বারো মাসি আম বারি-১১ এবং আশ্বিনার সাথে ক্রস করে বারি-৪ জাতের আম চাষের প্রতি উদ্বুদ্ধ করছে কৃষি বিভাগ। এটি হলে সারা বছরই আম পাওয়া যাবে।

পোকা দমনের ক্ষেত্রে তিনি সেক্স ফ্রেমন ট্যাব ও ইয়োলো কার্ডের পাশাপাশি ব্যাগিং পদ্ধতির কথা তুলে ধরে বলেন, এতে একদিকে যেমন পোকা থাকবে না অপরদিকে আমের রংও ভাল হবে। যদিও এতে খরচ একটু বেশি পড়বে। আম চাষের এসব প্রতিটি অর্গানিক পদ্ধতিই দিঘলিয়ার সবুজ উদ্যানে ব্যবহার করা হয় বলেও তিনি সেটি পরিদর্শনকালে দেখেছেন বলেও উল্লেখ করেন।

Read 1487 times

Leave a comment

Make sure you enter the (*) required information where indicated. HTML code is not allowed.