x 
Empty Product

রাজশাহী জেলা প্রশাসনের পটভূমি

User Rating:  / 0
PoorBest 

হাজারবছরের ইতিহাসের গতিধারা নির্ণয়কারী অসংখ্য নিদর্শন সমৃদ্ধ রাজশাহী জেলারবর্তমান আয়তন ২৪০৭.০১ বর্গ কিলোমিটার। এই জেলার দক্ষিণে ভারত, পশ্চিমেচাঁপাইনবাবগঞ্জ, পূর্বে নাটোর এবং উত্তরে নওগাঁ জেলা।

হাজারবছরের ইতিহাসের গতিধারা নির্ণয়কারী অসংখ্য নিদর্শন সমৃদ্ধ রাজশাহী জেলারবর্তমান আয়তন ২৪০৭.০১ বর্গ কিলোমিটার। এই জেলার দক্ষিণে ভারত, পশ্চিমেচাঁপাইনবাবগঞ্জ, পূর্বে নাটোর এবং উত্তরে নওগাঁ জেলা।

বলা বাহুল্য এইপ্রতিবেশী জেলাগুলো পূর্বে রাজশাহী জেলারই অন্তর্ভূক্ত ছিল। এখনো এইজেলাগুলোকে মিলিয়ে ‘বৃহত্তর রাজশাহী জেলা’বলা হ’য়ে থাকে।

এইজেলার নামকরণ কখন কিভাবে হ’য়েছিল এটা নিয়ে প্রচুর মতবিরোধ রয়েছে। তবেঐতিহাসিক অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়র মতে রাজশাহী রাণী ভবানীর দেয়া নাম। অবশ্যমিঃ গ্রান্ট লিখেছেন যে, রাণী ভবানীর জমিদারীকেই রাজশাহী বলা হতো এবং এইচাকলার বন্দোবস্তের কালে রাজশাহী নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। পদ্মারউত্তরাঞ্চল বিস্তীর্ন এলাকা নিয়ে পাবনা পেরিয়ে ঢাকা পর্যন্ত এমনকি নদীয়া, যশোর, বর্ধমান, বীরভূম নিয়ে এই এলাকা রাজশাহী চাকলা নামে অভিহিত হয়। অনুমানকরা হয় ‘রামপুর’এবং ‘বোয়ালিয়া’নামক দু’টি গ্রামের সমন্বয়ে রাজশাহী শহরগ’ড়ে উঠেছিল। প্রাথমিক পর্যায়ে ‘রামপুর-বোয়ালিয়া’নামে অভিহিত হলেওপরবর্তীতে রাজশাহী নামটিই সর্ব সাধারণের নিকট সমধিক পরিচিতি লাভ করে।বর্তমানে আমরা যে রাজশাহী শহরের সঙ্গে পরিচিত, তার আরম্ভ ১৮২৫ সাল থেকে।১৮৮৮ সালে এখানে বিভাগীয় সদর দপ্তরস্থানান্তরিত হলেও শহর গড়ে উঠা আদৌব্যাহত হয়নি। ফৌজদারী ও দেওয়ানী আদালত, পুলিশ এবং অন্যান্য সরকারী দফতর, এনজিও প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে এখানে আগমন ঘটে নানা শ্রেণীর ব্যক্তি, সরকারীকর্মচারী, আইনজীবী, চিকিৎসক, শিক্ষক প্রমুখের।

ভারতেরহিমাচল প্রদেশে গোমুখ বিন্দুর নিকটবর্তী ১২,৮০০ ফুট উচ্চে অবস্থিতহিমালয়ের গঙোত্রী হিমবাহ থেকে উৎপন্ন হ’য়ে গংগা নদী পশ্চিমবঙ্গেরমুর্শিদাবাদে প্রবেশের সময় দুটি শাখায় বিভক্ত হয়েছে। একটি শাখা ভাগীরথী যাকোলকাতার কাছে হুগলী নামে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। আর প্রধান শাখাটি পদ্মা নামেরাজশাহীতে প্রবেশ করেছে।

রাজশাহীজেলার ঐতিহাসিক নিদর্শনের মধ্যে হযরত শাহ মখদুম রূপোশ (রঃ) এর মাজার, বাঘামসজিদ, বরেন্দ্র যাদুঘর, পুঠিয়ার রাজবাড়ী উল্লেখযোগ্য।

বর্তমানেরাজশাহী জেলা নামে পরিচিত অঞ্চল ইতিহাসের ঊষালগ্নে পুন্ড্রবর্ধন নামেঅভিহিত পুন্ড্রদের রাজ্যের অংশবিশেষ ছিল। পূর্বদিকে করতোয়া, পশ্চিমেমহানন্দা এবং দক্ষিণে পদ্মানদী দ্বারা পরিবেষ্টিত এ রাজ্যের অন্তর্ভূক্তছিল এক বিস্তৃত ভূ-ভাগ। খ্রীস্টপূর্ব ৪র্থ শতাব্দীতে পুন্ড্রবর্ধন মৌর্যশাসনাধীন ছিল। খ্রীস্টীয় ৫ম শতাব্দীর শেষাবধি পর্যন্ত পুন্ড্রবর্ধনগুপ্তদের অধীনে একটি ‘‘ভুক্তি’’(প্রদেশ) ছিল। শশাঙ্ক নামে বঙ্গের একশক্তিমান শাসক ৭ম শতাব্দীর প্রারম্ভে এ অঞ্চল শাসন করেন। ৮ম শতাব্দীরমধ্যভাগ হতে ১২শ শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত এ অঞ্চল পাল বংশের শাসনাধীন ছিল।এরপর সেন বংশ বাংলায় কিছুদিন রাজত্ব করে। ১২০৪ খ্রীস্টাব্দে ইখতিয়ারউদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজী লক্ষ্মণ সেনের রাজধানী নদীয়া আক্রমন করে এঅঞ্চল দখল করে মুসলিম শাসনের গোড়াপত্তন করেন। এরপর সুলতান শামসুদ্দিনইলিয়াস শাহ্, হাবশী বংশ, হুসেন শাহী বংশ, আফগানগণ, করনারী বংশ, মুঘল বংশেরপর্যায়ক্রমিক শাসনাধীন ছিল এই অঞ্চল। মুঘল আমলের শেষ দিকে অর্থাৎ ১৮শ’শতাব্দীর প্রথমভাগে এ অঞ্চলে নাটোর রাজপরিবারের উত্থান ঘটে।

১৭৯৩সালে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের সময়ে এবং পরেও রাজশাহী জমিদারী নিয়েইরাজশাহী জেলা এলাকা গঠিত ছিল। এই বৃহৎ জমিদারী নাটোর রাজ্যের ব্যক্তিগতসম্পত্তি ছিল। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৭৮৩ সালের আগস্ট মাসে জজ ডালাসকে কালেক্টরনিযুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে তৎকালীন রাজস্ব বোর্ডের সচিব হ্যারিংটন ১৭৯১খ্রীষ্টাব্দে রাজশাহীর কমিশনাররূপে আগমন করেন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তপ্রবর্তনের সময় পর্যন্ত এ জেলা ছিল বাংলাদেশের সর্বাপেক্ষা বড় এবং অত্যন্তগুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বিভাগের অন্যতম। তৎকালে এ জেলা ছিল বর্তমান জেলারআয়তনের পাঁচগুণ বড়। ১৭৮৬ থেকে ১৮৯৭ খ্রীস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে রাজশাহীজেলার সীমানার ব্যাপক রদবদল হয়। ১৮১৩ খ্রীস্টাব্দে রহনপুর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জথানা, ১৮২১ খ্রীষ্টাব্দে আদমদিঘী, নৌখিলা, শেরপুর ও বগুড়া এবং ১৮৩২খ্রীষ্টাব্দে শাহজাদপুর, রানীগঞ্জ, মথুরা, রায়গঞ্জ ও পাবনা থানাকে এ জেলাথেকে পৃথক করা হয়। ১৮২১ খ্রীষ্টাব্দে ক্ষেতলাল, লালবাজার ও বদলগাছি এবং১৮৯৬ খ্রীস্টাব্দে মহাদেবপুর থানাকে রাজশাহী জেলার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এইব্যাপক রদ-বদলের ফলে এ জেলার আয়তন কমে যায় এবং পরবর্তীকালে বর্তমান আয়তনলাভ করে।

১৮২৫খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত এ জেলার সদর ছিল নাটোরে। পরে নাটোর অস্বাস্থ্যকরবিবেচিত হওয়ায় জেলা সদর রামপুর-বোয়ালিয়ায় স্থানান্তর করা হয়। ১৮২৯খ্রীস্টাব্দে নাটোর মহকুমা গঠিত হয়। নওগাঁ মহকুমা সৃষ্টি হয় ১৮৮৭খ্রীস্টাব্দে।

উনবিংশশতাব্দীতে এ জেলায় অনেকগুলো নীলের কারখানা ছিল। নীলকরেরা সাধারনতঃ ইংরেজছিল, তারা নীল চাষ করত না, কিন্তু তারা রায়তদেরকে দাদন বা অগ্রিম টাকা দিয়েএ কাজ করাত। এর ফলে নীলকরদের অত্যাচারে এ জেলার কৃষকদের জীবন অতিষ্ট হয়েউঠে। ১৮৫৯-৬০ খ্রীস্টাব্দে এ জেলায় নীল বিদ্রোহ দেখা দেয়। ১৮৬০খ্রীস্টাব্দে ভারত সরকার নীল কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী নীল চাষ কৃষকদেরইচ্ছাধীন বলে আদেশ জারী করে। নীল বিদ্রোহের উত্তরকালে ব্রিটিশ সরকার এজেলার প্রশাসনিক কাঠামোর রদবদল করেন। এ জেলায় তখন কালেক্টর এর পরিবর্তেম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হয়। উত্তর ভারতের শহীদ সৈয়দ আহমদ ব্রেলভী(১৭৮৫-১৮৩১) এর নেতৃত্বে এ জেলার অধিবাসীরা জেহাদ আন্দোলনে শরীক হন। ১৮৫৭খ্রীস্টাব্দের সিপাহী বিদ্রোহের সময় আভ্যন্তরীণ প্রশাসনের ক্ষেত্রে খুব বড়ধরনের অসুবিধা দেখা দেয় নাই।

১৮৮৩খ্রীস্টাব্দে রাজশাহী জেলায় প্রজা বিদ্রোহ শুরু হয়। কৃষকরা কর বন্ধেরআন্দোলন শুরু করেন। এ আন্দোলনের নেতা ছিলেন আস্তান মোল্লা। ভবিষ্যতে এজাতীয় প্রজা বিদ্রোহ রোধকল্পে ১৮৮৫ খ্রীস্টাব্দের বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইনদ্বারা রাজস্ব আইনের যথাযোগ্য সংশোধন করা হয়। পরবর্তীতে ১৯০৫ সালেরবঙ্গভঙ্গ, ১৯১১-১২ সালের খেলাফত আন্দোলন, স্ব-রাজ আন্দোলন, ১৯২১খ্রীস্টাব্দের মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন ইত্যাদি আন্দোলনেও এ জেলারঅধিবাসীগণ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর থেকে ১৯৭১সালের স্বাধীনতা পর্যন্ত রাজশাহীতে সমকালীন আন্দোলনসমূহ পরিচালিত হয়।

১৯৭১এর মুক্তিযুদ্ধে রাজশাহী গৌরবোজ্জল ভূমিকা পালন করে। পাক বাহিনীর সাথেরাজশাহী জেলায় প্রথম সম্মুখ যুদ্ধ হয় আড়ানী রেল স্টেশনের কাছে ২৮/২৯মার্চের রাতে। ২৫ পাঞ্জাবের এক কোম্পানী সৈন্য পাবনা থেকে পশ্চাদপসারণ করেরাজশাহীতে তাদের নিজেদের ব্যাটালিয়ানের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় ইপিআরবাহিনী, মুক্তিযোদ্ধা ও ছাত্র-জনতা তাদেরকে সম্পূর্ণরুপে ঘিরে ফেলে এবং ৩" মর্টারের গোলা বর্ষণ শুরু করে। শেষ রাতের দিকে পাকিস্তানী বাহিনীর গোলাবারুদ শেষ হয়ে গেলে একজন মেজর ও একজন ক্যাপ্টেনসহ সকলেই নিহত হয়। ৩১ মার্চরাজশাহী শহর থেকে ৬ মাইল দূরে অবসিহত খরকচ্চা নামক সহানে পাক সেনাদেরঅ্যামবুশ করে ৭ জনকে হত্যা ও একজনকে বন্দী করে। ১২, ১৩ ও ১৪ এপ্রিলরাজশাহীতে পাক বাহিনীর সাথে মুক্তিবাহিনীর অনবরত যুদ্ধ হয়। পাক বাহিনীরক্রমাগত আর্টিলারী, পদাতিক ও বিমান হামলায় মুক্তি বাহিনীর সৈন্যরানবাবগঞ্জের দিকে সরে যায়। এরপর রাজশাহী থেকে ১৮ মাইল দূরে নবাবগঞ্জের পথেগোদাগাড়ীতে মুক্তি বাহিনী প্রতিরক্ষা ব্যুহ তৈরী করে। কিন্তু ১৭ এপ্রিল পাকবাহিনীর প্রচন্ড বিমান হামলা সত্তেবও ২১ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত পাক বাহিনীকেঠেকিয়ে রাখা হয়। পাক বাহিনী এরপর বানেশ্বর ও সারদা’র পতনের পর ৭০০/৮০০লোককে গুলি করে ও পেট্রোল দিয়ে পুড়িয়ে মেরে এক নৃশংস গণহত্যা চালায়।স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত এ জেলায় ৩২ টি থানাসহ ৪টি মহকুমা ছিল।১৯৮৪ সালে রাজশাহীর ৪টি মহকুমাকে রাজশাহী, নওগাঁ, নাটোর এবং নবাবগঞ্জ- এইচারটি স্বতন্ত্র জেলায় উন্নীত করা হয়।

Leave your comments

0
terms and condition.
  • No comments found