x 
Empty Product

Articles

আমের সঠিক পরিচর্যা

User Rating:  / 0
PoorBest 

আমকে বলা হয় ফলের রাজা। রাজা হলেও বেড়ে ওঠার সময় অন্যান্য ফলের মতো তাকেও নানা সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়। এসব সমস্যার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণই প্রধান। সঠিক সময়ে রোগ ও পোকামাকড় দমন করতে ব্যর্থ হলে আমের ফলন অনেক কমে যায়। তবে এসব রোগ ও পোকামাকড় দমনের জন্য সঠিক বালাইনাশক বা ছত্রাকনাশক সঠিক মাত্রায়, সঠিক সময়ে, সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করে ব্যবহার করলে আমের ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা অনেকটাই কমে যায়। আমের ভালো ফলন পাওয়ার জন্য পরিচর্যা শুরু করতে হবে আমবাগানে মুকুল বের হওয়ার আগেই। গাছে মুকুল আসার পরও সমানতালে যত্ন নিতে হবে। আমের ভালো ফলন পেতে করণীয় পদক্ষেপগুলো কৃষক ভাইদের

উপকারার্থে তুলে ধরা হলো—

আমের আনথ্রাকনোজ :পাতায়, কাণ্ডে, মুকুলে ও ফলে এই রোগ দেখা যায়। পাতায় অনিয়মিত দাগ দেখা যায় যেগুলো পরে বাদামি থেকে কালো হয়ে বড় বড় দাগের সৃষ্টি করে এবং পাতা ঝরে যায়। মুকুল কালো হয়ে যায় ও গুটিগুলো পড়ে যায় এবং পাকা আমে স্পষ্ট দাগ দেখা যায় যা পরবর্তী সময়ে বড় হয়ে আমে পচন ধরায়। এ রোগের প্রতিকার হচ্ছে- মুকুল আসার আগে টিল্ট ২৫০ ইসি- ০.৫ মিলিলিটার/লিটার বা ডায়থান এম ৪৫-২ গ্রাম/লিটার স্প্রে করতে হবে এবং বোরডোয়াক্স মিশ্রণের ১% দ্রবণ ১০-১২ দিন পর পর ৩-৪ বার স্প্রে করতে হবে।
বোঁটা পচা রোগ :

এটি আমের অন্যতম মারাত্মক রোগ। প্রথমে বোঁটার দিকে পচন ধরে পরে পুরো ফলটি পচে গিয়ে কালো বর্ণ ধারণ করে। গাছে থাকা অবস্থায় জীবাণুটি মুক্ত অবস্থায় থাকে পরে আম সংগ্রহের পরে উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতায় রাখা হলে আক্রান্ত আমের রং বাদামি হয়ে যায়, যা আর খাওয়ার উপযোগী থাকে না। এ রোগের প্রতিকার হচ্ছে প্রায় ২-৩ সে.মি. বোঁটা রেখে আম সংগ্রহ করতে হবে এবং ডায়থান এম ৪৫ অথবা বেভিসটিন (০.২%) স্প্রে করতে হবে।
আমের অঙ্গ বিকৃতি বা ম্যালফরমেশন :

এ রোগ সাধারণত মুকুলে হয়। তবে ডালের আগায়ও হতে পারে। আক্রান্ত মুকুল কালো হয়ে যায় এবং মুকুলগুলো একীভূত হয়ে জটলার সৃষ্টি করে। এ রোগের প্রতিকার হচ্ছে- আম ধরার ৮০ থেকে ৯০ দিন আগে ন্যাপথেলিক এসিটিক এসিড স্প্রে করতে হবে ও আক্রান্ত স্থানে কার্বোন্ডাজিম (১ গ্রাম/ লিটার পানি) স্প্রে করতে হবে।


পাউডারি মিলডিউ :পাউডারি মিলডিউ রোগের আক্রমণ প্রধানত আমের মুকুল ও কচি আমে প্রকাশ পায়। প্রথমে আমের মুকুলের শীর্ষ প্রান্তে সাদা বা ধূসর বর্ণের পাউডারের আবরণ দেখা যায়। কচি পাতাতেও রোগের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এই পাউডার হচ্ছে ছত্রাক ও তার বীজকণার সমষ্টি। হালকা বৃষ্টি, মেঘলা বা কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশ এ রোগের জীবাণুর ব্যাপক উত্পাদনে সহায়তা করে। অনুকূল আবহাওয়ায় এই পাউডার সম্পূর্ণ মুকুলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত মুকুলের সব ফুল নষ্ট হয়ে যায়। এ অবস্থায় শুধু মুকুলের দণ্ডটি দাঁড়িয়ে থাকে। আক্রমণ মারাত্মক হলে গাছে কোনো ফল ধরে না। তাছাড়া বেশি আক্রান্ত কচি আম ঝরে পড়ে। এ অবস্থায় রোগের লক্ষণ দেখা দিলেই সালফার বা গন্ধকযুক্ত যে কোনো ছত্রাকনাশক প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম ভালোভাবে স্প্রে করতে হবে।

হপার পোকা দমন : হপার পোকা অন্ধকার বা বেশি ছায়াযুক্ত স্থান পছন্দ করে। তাই নিয়মিতভাবে গাছের ডালপালা ছাঁটাই করতে হবে, যাতে গাছের মধ্যে আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে। আমের মুকুল যখন ৩ থেকে ৪ সেন্টিমিটার লম্বা হয় তখন একবার এবং আম যখন মটর দানার মতো আকার ধারণ করে তখন আরেকবার প্রতি লিটার পানিতে ১ মিলি লিটার হারে সাইপারমেথ্রিন (রিপকর্ড বা সিমবুস বা ফেনম বা এরিভো) ১০ ইসি মিশিয়ে পুরো গাছে স্প্রে করতে হবে। আমের হপার পোকার কারণে যেহেতু সুটিমোল্ড বা ঝুল রোগের আক্রমণ ঘটে তাই রোগ দমনের জন্য প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে সালফার জাতীয় ছত্রাকনাশক হপার পোকা দমনের জন্য ব্যবহার করা কীটনাশকের সঙ্গে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
পরগাছা উদ্ভিদ : পরগাছা উদ্ভিদের বীজ আম গাছের ডালে অঙ্কুরিত হয়ে বাড়তে থাকে। পরগাছা ডাল থেকে প্রয়োজনীয় পানি, খাদ্যরস, খনিজ পদার্থ ইত্যাদি শোষণ করে বেঁচে থাকে। পরগাছার শিকড় থাকে না, তারা শিকড়ের মতো এক প্রকার হস্টোরিয়া তৈরি করে। হস্টোরিয়া গাছের ডালে প্রবেশ করে ডাল থেকে খাদ্য গ্রহণ করে। আক্রান্ত ডালের প্রায় সব খাবার পরগাছা খেয়ে ফেলে। ফলে আক্রান্ত ডাল দুর্বল হয়ে পড়ে। আক্রমণ বেশি হলে আম ডালের অস্তিত্ব থাকে না বরং পরগাছা প্রভাব বিস্তার করে বাড়তে থাকে। লরানথাস জাতীয় পরগাছার পাতা দেখতে কিছুটা আমপাতার মতোই। তাই ভালোভাবে লক্ষ্য না করলে দূর থেকে পরগাছার উপস্থিতি বোঝা যায় না। পরগাছার প্রতিকার পেতে আক্রান্ত ডাল পরগাছার গোড়াসহ কেটে ফেলতে হবে। কাটা স্থানে রোগের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য বোর্দো পেস্টের প্রলেপ দিতে হবে। পরগাছায় ফুল-ফল আসার আগেই পরগাছা ছাঁটাই করা উচিত।


আমের পোকা ম্যাঙ্গো উইভিল: প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন জেলায় আমের ভেতর পোকা দেখা যায়। আমের বাইরে খোসা দেখে মনে হয় ভেতরে কোনো সমস্যা নেই। অথচ আম পাকার পর তা কাটলে তার ভেতরে দেখা যায় পোকা কিলবিল করছে। এ পোকা একবার আমের ভেতরে ঢুকে গেলে কোনোভাবেই দমন করা সম্ভব নয়। তাই মুকুল আসার সময় এ পোকা দমন করতে হবে। যে আম গাছে একবার ওই পোকা দেখা যাবে সে গাছে প্রতিবছরই এ পোকার আক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পাশাপাশি আশেপাশের আরো আমগাছে এ পোকার আক্রমণ দেখা দিতে পারে। এ পোকা দমন করতে হবে মুকুল ধরার আগে কিংবা মুকুল ধরার সময়।

আমের ভেতর ম্যাঙ্গো উইভিল নামের এ পোকা আমের ক্ষতি করে থাকে। আশ্চর্যের বিষয় হল আমের ত্বকে কোনো ছিদ্র থাকে না। এত বড় পোকা কীভাবে আমের ভেতর ঢুকে এবং বেঁচে থাকে তা সত্যিই অবাক করার মত। আমের যখন মুকুল আসে, তখন এ পোকা মুকুলে ডিম পাড়ে। মুকুল থেকে কচি আম হওয়ার সময় ফুলের ভেতরই ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়ে কচি আমের ভেতর আস্তে আস্তে ঢাকা পড়ে। আমের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এর ভেতরের পোকাও বড় হতে থাকে। পোকাগুলো দিন দিন বেড়ে ওঠে আম খেয়ে। সাধারণত মুকুল ধরার সময় তাপমাত্রা ২৫ থেকে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস অথবা একটু বেশি এবং উচ্চ আর্দ্রতা থাকলে এ পোকা আক্রমণ করার আশঙ্কা বেশি থাকে। এক বছর আক্রমণ করলে প্রতিবছরই এ পোকা আক্রমণ করে। আমের ভেতর পোকা ঢুকে গেলে দমনের কোনো ব্যবস্থা নেই। এটি দমনের জন্য প্রতি ১০ লিটার পানিতে ১৫ মিলিলিটার ম্যালাথিয়ন বা সুমিথিয়ন মিশিয়ে মুকুল ধরার সময় মুকুলে স্প্রে করতে হবে। অথবা ৩০ মিলিলিটার ডায়াজিনন বা ১৫ মিলিলিটার ডাইমেক্রন প্রতি ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে মুকুলে স্প্রে করতে হবে। এ ছাড়া আমগাছের নিচে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। ডিমের গাদা নষ্ট করতে হবে। আক্রান্ত আমগাছের নিচে পড়ে থাকা পাতা ও মুকুল পুড়িয়ে ফেলতে হবে। মুকুল ধরার সময় এলাকার সব আক্রান্ত গাছে একসঙ্গে কীটনাশক স্প্রে করতে হবে। অন্যথায় যে গাছে স্প্রে করা হবে না, সেই গাছে অন্য গাছ থেকে পোকা আক্রমণ করবে। এ ছাড়া আমের ফলন বাড়াতে হলে বছরে অন্তত দু'বার সুষম মাত্রায় সার দিতে হবে। সেচ দিতে হবে প্রতি মাসে একবার। অপ্রয়োজনীয় ডালপালা ছেঁটে দিতে ধরা। আমগাছের স্বভাব হচ্ছে প্রতি ডালে এক বছর পর পর আম ধরে। এ জন্য কোনো গাছে এক বছর ফলন ভাল হলে অন্য বছর ফলন কম হয় অথবা হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।


এক নজরেআবার দেখুন:


আমের আনথ্রাকনোজ: লক্ষণ: ১. পাতায়, কাণ্ডে, মুকুলে ও ফলে এই রোগ দেখা যায়;
২. পাতায় অনিয়মিত দাগ দেখা যায় যেগুলো পরে বাদামী থেকে কালো হয়ে বড় বড় দাগের সৃষ্টি করে এবং পাতা ঝরে যায়;
৩. মুকুল কালো হয়ে যায় এবং গুটিগুলো পড়ে যায়;
৪. পাকা আমে স্পষ্ট দাগ দেখা যায় যা পরবর্তীতে বড় হয়ে আমে পচন ধরায়।

দমন: ১. মুকুল আসার আগে টিল্ট ২৫০ ইসি- ০.৫ মিলিলিটার/ লিটার বা ডায়থান এম ৪৫ -২ গ্রাম/লিটার সেপ্র করতে হবে;
২. বোরডোয়াক্স মিশ্রণের ১% দ্রবণ ১০-১২ দিন পর পর ৩-৪ বার সেপ্র করতে হবে।

বোঁটা পচা রোগ: লক্ষণ: ১. সবচেয়ে মারাত্মক রোগ, প্রথমে বোঁটার দিকে পচন ধরে পরে পুরো ফলটি পচে গিয়ে কালো বর্ণ ধারণ করে;
২. প্রথমে গাছে থাকা অবস্থায় জীবাণুটি মুক্ত অবস্থায় থাকে পরে আম সংগ্রহের পরে উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতায় রাখা হলে আক্রান্ত আমের পাল্পগুলো বাদামী হয়ে যায় যা আর খাওয়ার উপযোগী থাকে না।

দমন: ১. প্রায় ২-৩ সে.মি. বোঁটা রেখে আম সংগ্রহ করতে হবে;
২. ডায়থান এম ৪৫ অথবা বেভিসটিন (০.২%) সেপ্র করতে হবে।

পাউডারি মিলডিউ: লক্ষণ: ১. আক্রান্ত আম গাছের পাতায় সাদা পাউডারের মত গুঁড়ো দেখা যায়, পরে আক্রান্ত স্থানের টিস্যুগুলো মারা যায় এবং কালো বর্ণ ধারণ করে,
২. আক্রান্ত আমের মুকুল বা গুটি ঝরে পড়ে।

দমন: ১. থিওভিট বা সালফার জাতীয় যেকোনো ছত্রাকনাশক (০.২%) ব্যবহার করতে হবে।

স্যুটি মোল্ড: লক্ষণ: ১. পাতা, ফল, মুকুল আক্রান্ত হলে কালো কালো দাগ পড়ে যায়।

দমন: ১. স্যুটি মোল্ড দমনে সালফার (৪ গ্রাম/লিটার) ব্যবহার করা যেতে পারে।

আমের অঙ্গ বিকৃতি বা ম্যালফরমেশন: লক্ষণ: ১. এটা সাধারণত মুকুলে হয় তবে ডালের আগায়ও হতে পারে;
২. আক্রান্ত মুকুল কালো হয়ে যায় এবং মুকুলগুলো একীভূত হয়ে জটলার সৃষ্টি করে।

দমন: ১. আম ধরার ৮০ থেকে ৯০ দিন আগে ন্যাপথেলিক এসিটিক এসিড সেপ্র করতে হবে;
২. আক্রান্ত স্থানে কার্বোন্ডাজিম (১ গ্রাম/ লিটার পানি) সেপ্র করতে হবে।
এগ্রোবাংলা ডটকম

Leave your comments

0
terms and condition.
  • No comments found