x 
Empty Product

ঝড়ের দিনে মামার বাড়িতে আম কুড়োতে খুব সুখ। কেন নিজের বাড়িতে কি কম সুখ? নিজের তো সব সময় কুড়োই, তাতে নতুনত্ব নেই। মামাবাড়িতে মজাই আলাদা। ওখানে মা-বাবার কড়া শাসন নেই। মামা-মামীও তাই বলে একেবারে ছেড়ে দেয় না, চোখে চোখে রাখে। যাতে কোনো বিপদ না হয়।

ছেলেবেলা থেকে কত রকম আমই না খেয়েছি। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম হল সত্যিকার অর্থে ‘ফলের রাজপুত্তুর’। আমকে সারাবিশ্ব এই নামে চেনে। বিশ্বের সব দেশে আম নেই, কিন্তু একবার যে এই আম খেয়েছে তার পক্ষে একে ভোলা সম্ভব নয়।

রাজশাহী, নবাবগঞ্জে এর আমের মধ্যে সেরা হল ল্যাংড়া, ফজলি, ক্ষীরসাপাতি (আমরা বলি গোপালভোগ), হিমসাগর, লক্ষণভোগ, মোহনভোগ, গোপালভোগ, বোম্বাই, ফজলি। আছে রানীপসন্দ, বেগম পসন্দ, বাদশাপসন্দ।

আবার উন্নত জাতের গবেষণাগারে উদ্ভাবিত আম হল বারি-১, বারি-২, বারি-৩ এবং বারি-৪। এখন নতুন যোগ হয়েছে আম্রপালি ও মল্লিকা। দিনাজপুরের সূর্যপুরীও বিখ্যাত।

mango05.jpgভারতের সেরা আম হল মুম্বাইয়ের পশ্চিমাঞ্চলের আফুজ বা আলফাঁসো ও পাইরি, দক্ষিণাঞ্চলের নীলম ও বাঙ্গানপল্লী, অন্ধ্রে মালগোরা ও সুবর্ণরেখা, যুক্তপ্রদেশ ও বিহারে চৌশা, দশেরী ও ল্যাংড়া, পশ্চিমবঙ্গে গুলাবখাস ও বোম্বাই।

এছাড়া ফজলি (বা মালদহের আম), বিভিন্ন নামে পসন্দ (রানীপসন্দ, বেগমপসন্দ ইত্যাদি) তো আছেই।

বাংলাদেশ ও ভারতের নানা জায়গা থেকে সংগ্রহ করে একটি ছোটখাট তালিকা আমিও করতে পারি। এর মধ্যে সব আমাদের দেশে হয়তো নেই। আমাদের দেশে থাক বা না থাক নামে তো আছে। ভারতের সঙ্গে মিলে আছে। যেমন বাদশাহী, আলমশাহী, বৃন্দাবনী, দিলশাদ, কোহিনূর, কোহেতুর, ওয়াবজান, হায়াত, বড় শাহী, ছোট শাহী। এসব আমের নামের বেলায় বাংলাদেশ ভারতের মধ্যে সীমা নেই।

আবার আছে দিলখোশ, ফেরদৌস পসন্দ, সুলতান পসন্দ, বোম্বাই ও গোলাবখাস প্রভৃতি আম নবাবগঞ্জ, মালদহ ও মুর্শিদাবাদ এলাকায় হয়। মালদহ ও মুর্শিদাবাদ ভারতে, আমাদের চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাশে। নবাবগঞ্জের পুবে রাজশাহী, রাজশাহীতেও এর অনুকরণে নাম আছে।

 

mango_green.jpgরাজশাহী ও নবাবগঞ্জে তাই আছে ক্ষীরসাপাতি, বোম্বাই ক্ষীরসাপাতি, সর ক্ষীরসাপাতি, ছোট ক্ষীরসাপাতি, কোহেতুর, জাফরান, মোহনভোগ প্রভৃতি। এর অধিকাংশই ভালো আম। আমার তো নাম শুনলেই মুখে পানি আসে। শুনতে শুনতে আসে। আসলে সব আম আমিও খাইনি।

প্রথমে আসে বোশেখি আম। তারপর হিমসাগর, ক্ষীরসাপাতি, ল্যাংড়া, লক্ষণভোগ, আষাঢ়ী, শ্রাবণী, ভাদুরিয়া, লম্বা এবং আশ্বিনী প্রভৃতি ক্রমান্বয়ে। এদের মধ্যে কত রকম নাম! যেমন, বিসমনী, ভরত, বিড়া, ভোজ, বৃন্দাবনী, বাবুই ঝাঁকি, বাতাস, চম্পা, চকচকি, ইহুদি পছন্দ, চাপাতি, দুধসর। আরও আছে দ্বারিকা, দুধকুমার, দুধভোগ, আক্কেল গরম, ডায়মন্ড, নীলম, দোকশলা, বারোমাসি, কাঁচামিঠে, মিছরীভোগ, মিঠুরা তোতাপুরী, কোহেতুর, কপটভাঙ্গা, হাতিঝুল ইত্যাদি।

না, না। আরও আছে- কোলোপাহাড়, ফারীয়া, লতা, তোতা ফজলি, চিনি ফজলি, মালদহ, গৌরজিৎ, মোহনভোগ, কিষাণভোগ, কালিভোগ, শিকাভোগ, সীতাভোগ, মিছরিভোগ, চিনিভোগ। আরও কত ভোগ যে আছে আমিও জানি না।

 

mango04.jpgআবার ল্যাংড়ার মধ্যেও আছে নানা নাম। যেমন, ল্যাংড়া, হাজি ল্যাংড়া, কাশীর ল্যাংড়া ইত্যাদি। আরও নানা নামের ল্যাংড়া আছে। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাগানে গিয়েও সব নাম লিখে আনতে পারিনি। আর খাওয়ার কথা জানতে চাইলে হিসাব দিতে পারব না। যত বাগানে গেছি তত বার খেয়েছি। একটা কথা তোমাদের বলে রাখি। যত গাছপাকাই হোক না, ওই গাছপাকা আম আরও তিন দিন রেখে খেলে তবেই আমের আসল ও মধুর স্বাদ পাওয়া যাবে। তখন আম হবে সত্যিকার অর্থে অমৃত ফল। প্রাচীন কালে গ্রীকরা একে বলেছেন ‘থিওব্লোমা’, অর্থাৎ দেবভোগ্যও অমৃত ফল।

ফজলি নামটি ব্রিটিশ যুগে মালদহের কালেক্টর র‌্যাভেনশ সাহেবের দেওয়া। ফজলি নামে গ্রামের এক গরিব মুসলমান নারী তাঁকে নিজের গাছের আমটি খাইয়ে চমৎকৃত ও তৃপ্ত করেছিলেন। তাই সাহেব ওই আমের নাম ফজলি দিয়েছিলেন বলে শোনা যায়।

ঠিক তেমনি মিথিলার (বিহার রাজ্যের) জমিদার কৃষ্ণপ্রসাদ ঠাকুরের নামে হয় ভালো জাতের একটি আমের নাম কিষণভোগ। এছাড়া রাজা-বাদশা, উজির-নাজির, নবাব-বেগম, মোল্লা-পুরুত কার নামে না আমের নাম আছে। এমনকি সেই কালের শত্রু ইংরেজ সাহেবের নামেও আম আছে। সারাবিশ্বে এক আম ছাড়া কোনো ফলের এত নাম নেই, দুশো ভাগের এক ভাগও নেই। বাংলাদেশ ভারতে কেউ বলেন দু’ হাজার নাম আছে, কেউ বলেন পাঁচ শো রকম আমের নাম পাওয়া যায়।

 

mango03.jpgপলাশির আমবাগানে অল্প সংখ্যক সাহেব সৈন্যের হাতে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য অস্ত গেলেও তার সঙ্গে যোগ দিয়েছিল কিছু এ দেশীয়। নবাব সিরাজদৌলার প্রধান সিপাহসালার ছিল মীর জাফর। সে তার অনুগত সব সৈন্য নিয়ে ইংরেজের পক্ষে যোগ দিয়ে নবাবের পক্ষে যুদ্ধ থেকে বিরত থাকে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের রাজাকার, আলবদর ও আল সামস ছিল আরও মারাত্মক। তারা সরাসরি পাকিস্তানিদের সঙ্গে যোগ দিয়ে এদেশের মুক্তিযোদ্ধা ও নিরীহ মানুষ হত্যা করেছিল। আর এখনও তারা বাংলাদেশে বিরোধীতা করে চলেছে।

ইংরেজী সাহেবরা পলাশির যুদ্ধে জিতে গেলে এই আমাবাগানের উল্লেখ্যযোগ্য উন্নয়নে অবদান রাখেন। সাহেবরা এদেশের আমে এমন মজে গেছেন যে তারাও আম নিয়ে বিস্তর মাথা ঘামিয়েছেন। ঘাম ফেলেছেন। আর কী নিয়েই না মাথা ঘামাননি। নদী, পাখি, ভাষা, পুরাতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব সবকিছু নিয়ে গবেষণা করেছেন। এবং তার ফল রেখে গেছেন। উইলিয়াম ক্যারি ও মিসেস হ্যানা ক্যাথারিনা মুলান্স বাংলা ভাষা চর্চা ও রচনায় অমর হয়ে আছেন।

ডেভিস সাহেব উদ্ভাবিত সেকালের একটি বিখ্যাত বর্ণসংকর আমকে বলা হত ‘ডেভিস ব্রিড’। আর আজকের যে সব বিখ্যাত আম আমরা খাই তার সবগুলোই অনেক গবেষণার ফলে পাওয়া । বুনো আমকে শত শত বছর কলম, জোড়কলম, বর্ণসংকর, করে আজকের সুমিষ্ট আম পেয়েছি। এজন্য আজকের আমকে বলা হয় ‘কালটিরভর’ বা ‘আবাদিত’ আম। আমাদের দেশি রাজা-রানী, নবাব-বেগমদের পাশাপাশি আমের তালিকায় আছে ইংরেজ ‘বুথ নাট’, ‘হলওয়েল’, হেস্টিংস’, ‘পিটার হরস’ প্রভৃতি সাহেবের নাম।

mango.jpg আবার আশু মুখার্জি, বংশী ঘোষের নামেও আম আছে। কিছু কাল আগেও কোলকাতার বাজারে চন্দননগর থেকে দুটি উৎকৃষ্ট আম আসত। তাদের নাম চ্যাটার্জী ও ব্যানার্জি।

এমন আম আছে যা অত্যন্ত সুস্বাদু ও মিষ্টি। আবার এমন টক আম আছে যা ভীষণ ভীষণ টক। বাংলা ভাষার বিখ্যাত ব্যাকরণবিদ ড. সুকুমার সেন সেই যম-টক আম মুখে দিলে কেমন লাগে বলেছেন। তা হল, প্রথমে ‘তুড়ুক তোবা, দোসরা বাঁদর বোবা, তেসরা কাক দেশান্তরী’। অর্থাৎ এই যম টক আম খেয়ে বানর বোবা ও কাক দেশ ছেড়ে চলে যায়। এই আম হল বৈজ্ঞানিক নামে -- সিলভাটিকা রকসবা। আর খাওয়ার উপযুক্ত আমের বৈজ্ঞানিক নাম মঙ্গিফেরা ইন্ডিকা।

ইংরেজদের আগে পর্তুগিজ আলম থেকে এদেশে শত শত বছর ধরে পশ্চিমারা আমাদের আমলের আমের প্রশংসা করে বিস্তর লেখালেখি করে গেছেন। ওই যে সেই বাদশা অসময়ে আম খেতে চাইলে নিরুপায় হয়ে উজির এক কাণ্ড করেন। কারণ বাদশার আম খাওয়ার রোগ না হয় সারবে না। বাদশা অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকলে রাজ্যের সর্বনাশ। তাই উজির উপায় না দেখে, নিজের দাঁড়িতে তেঁতুলের একটু টক ও চিনি মিশিয়ে বাদশাকে চুষতে দেন। ব্যস, বাদশাও দাড়িকে মনে করলেন আমের আঁশ, আর টক মিষ্টি থেকে পেয়ে গেলেন স্বাদ। বাদশা রোগ সেরে গেল, রাজ্যও বাঁচল।

আর ইংরেজ সাহেব এই পাকা হড়হড়ে আম খেতে গিয়ে হাত জামা কাপড় নষ্ট করে ফেললেন। তাই তিনি বললেন, আম খাওয়ার শ্রেষ্ঠ উপায় হল, আমটা নিয়ে বাথটবে চলে যাওয়া সেখানে আমটা খেয়ে একেবারে স্নান গোসল শেষ করে পরিস্কার হয়ে চলে আসাই সেরা উপায়। কিন্তু তাঁরাই আবার আমকে বললেন, ‘প্রিন্স অব ফ্রুট’ বা ‘ফলের রাজপুত্তুর’। আর অনেকেই এদেশীয়দের সঙ্গে মনে প্রাণে সায় দিয়ে বলেছেন, আম ফলের রাজা।