x 
Empty Product

আমের মৌসুমে ফরমালিনের অপপ্রচার থেকে মুক্তি চান রাজশাহীর আম ব্যবসায়ীরা। অল্প কিছু অসাধু ব্যবসায়ী হয়তো আমে ফরমালিন মেশাতে পারে। কিন্তু বেশিরভাগ ব্যবসায়ীরা তা করেন না। অসাধুদের কারণে পুরো ব্যবসায়ী ও কৃষক সমাজ ভুক্তভোগী হচ্ছে বলে অভিযোগ ভাল ব্যবসায়ীদের।

বাংলাদেশে আমের প্রধান উৎপাদনকারী অঞ্চল উত্তরবঙ্গের জনপ্রতিনিধি হিসেবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম সোমবার গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে মতবিনিময় করেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় রাজশাহীর দু’জন আম উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ী উপস্থিত থেকে ফরমালিনের অপপ্রচার থেকে মুক্তি কামনা করেন।

মতবিনিময়কালে শাহরিয়ার আলম জানান, বিগত কয়েক বছরের তুলনায় রাজশাহীর আমে কীটনাশক ও ফল পাকানোর উপকরণ ব্যবহারে উক্ত অঞ্চলের আম চাষী ও ব্যবসায়ীগণ বর্তমানে অনেক সচেতন। গত বছর রাজশাহীর আমে রাসায়নিক পদার্থ মেশানোর মাত্রা কম ছিল। এ বছর অবস্থার আরও উন্নতি হয়েছে।

এ বিষয়ে সাংবাদিকদের অনুসন্ধানী ও পর্যবেক্ষণমূলক রিপোর্ট করারও আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী।

সভায় উপস্থিত রাজশাহীর বাঘা এলাকার আম চাষী ও ব্যবসায়ী মো. জিল্লুর রহমান বলেন, শুধু আম চাষী বা ব্যবসায়ীরা নয়, গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষও আমে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মেশানোর বিরুদ্ধে যথেষ্ট সজাগ ও সোচ্চার।

রাজশাহীর চারঘাট থানার আম চাষী ও ব্যবসায়ী মো. শওকত আলী বুলবুল বলেন, আমে ফরমালিনসহ অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থ মেশানোর যে প্রচার তা সম্পূর্ণ সঠিক নয়। এ ধরনের প্রচারণার ফলে এ বছর রাজশাহীর কোনো আম বাগানেই এ পর্যন্ত অগ্রিম আম বিক্রি হয়নি। এ অবস্থা চলতে থাকলে রাজশাহীর আম শিল্পে নিয়োজিত হাজার হাজার চাষী, ব্যবসায়ী ও প্যাকেজিংসহ অন্যান্য কাজে নিযুক্ত শ্রমিকদের অর্থনৈতিক অবস্থা মুখ থুবড়ে পড়বে।

সভায় উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীরা আম দ্রুত পাকানোর জন্য ব্যবহার হওয়া ইথিকোন ইথাইল ব্যবহার মানবদেহের জন্য সহনীয় পর্যায়ে রাখা এবং কৃষক, ব্যবসায়ীসহ সকলকে বাজারজাতকরণের সকল পর্যায়ে ফরমালিন ব্যবহার হতে বিরত থাকার পরামর্শ দেন।

 সাধারণ চাষীরা নয়, আমে ক্ষতিকর রাসায়নিক প্রয়োগে জড়িত অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাসায়নিকযুক্ত আম আর বিষ খাওয়ার মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই

অসময়ে আম কেনার ক্ষেত্রে ক্রেতাদের অধিক সচেতন হওয়া দরকার

বাঙ্গালির অতিপ্রিয় ফল আমের পচন রোধে ফরমালিন মেশানো হচ্ছে! গাছে মুকুল আসার পর থেকে পাকা পর্যন্ত বাগানে, আড়তে দফায় দফায় আমে দেয়া হচ্ছে সায়ানাইড, ফরমালিনসহ নানা ধরনের কেমিক্যাল। আমের রাজধানী বলে খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জ ছাড়াও মেহেরপুর, রাজশাহী, নাটোর ও অন্যান্য জেলায় এই অসাধু কার্যক্রম চালাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট বাগান মালিক, চাষী থেকে শুরু করে স্থানীয় ফল ব্যবসায়ীরা। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে কোথায়, কখন, কিভাবে আমে বিষ মেশানো হয় সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানা গেছে।
Rajshahi Mango
এদিকে গত বৃহস্পতিবার কাওরান বাজারের ৬টি আড়তে আমে মাত্রাতিরিক্ত ফরমালিনসহ বিভিন্ন কেমিক্যাল থাকার প্রমাণ পেয়েছে মোবাইল কোর্ট। বিষাক্ত কেমিক্যালে ভরা এই আম খাওয়া আর বিষ খাওয়ার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এই আম খেলে মানবদেহে নানা ক্ষতি সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছেন তারা।

জানা গেছে, মধ্যস্বত্বভোগী, অতি মুনাফালোভী, ফড়িয়া, ব্যবসায়ী ও বাগান মালিক এবং আড়তদাররা আমে বিষাক্ত কেমিক্যাল ও ফরমালিন মিশিয়ে বছরের পর বছর বাজারজাত করছে। মূলত তাদের হাতেই দেশের ফল ব্যবসা নিয়ন্ত্রিত হয়। বাজারে ৯৫ ভাগ আমের মধ্যেই বিষাক্ত কেমিক্যাল রয়েছে। তার বাস্তব প্রমাণও মিলছে। প্রায় প্রতিদিনই মোবাইল কোর্ট অভিযানে নেমে টনে টনে কেমিক্যাল যুক্ত আম ধ্বংস করে সংশ্লিষ্টদের জরিমানা করছেন। কিন্তু অজানা কারণে আমে বিষ মেশানো বন্ধ হচ্ছে না।

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার কাওরান বাজারে ১০টি আমের আড়তে র্যাবের মেজিস্ট্রেট আনোয়ার পাশার নেতৃত্বে অভিযান চালানো হয়। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে এসব আড়তে সরাসরি আম আনা হয় বলে দাবি করা হয়। বিশেষজ্ঞরা ৬টি আড়তে মালিকদের উপস্থিতিতে আম পরীক্ষা করে তাতে মাত্রাতিরিক্ত কেমিক্যাল থাকার প্রমাণ পান। এ কারণে প্রত্যেক আড়ত মালিককে দুই লাখ টাকা করে জরিমানা এবং ৪ হাজার টন আম জব্দ করে মোবাইল কোর্ট। পরে সেই আম ধ্বংস করা হয়।

আমে কেমিক্যাল মেশানো সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসী অনুষদের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক বলেন, আম স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পাকে। কিন্তু মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা উচ্চ মূল্যে বিক্রি করার জন্য অপরিপক্ক আম কেমিক্যাল দিয়ে আগেই পাকিয়ে ফেলে। আর পচন রোধে অর্থাত্ দীর্ঘদিন তরতাজা রেখে বিক্রির জন্য সেই আমে মেশানো হয় ফরমালিন। এই আম পাকা ও তরতাজা দেখে এক শ্রেণীর ক্রেতা কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েন। ৪০ টাকা কেজির আম ১শ' টাকা কেজিতে কিনতেও দ্বিধা করেন না ক্রেতারা। তারা জানেন না যে, টাকা দিয়ে ফলের নামে বিষ কিনে নিয়ে গেছেন পরিবারের জন্য। এই সকল ক্রেতার মন-মানসিকতার পরিবর্তন করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

আ ব ম ফারুক আরো জানান, কোন্ সময় কোন্ আম স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পাকে তা অনেকেই জানে। রাজশাহীর লেংড়া আম অনেক আগেই বাজারে আসে। এই লেংড়া আম আষাঢ় মাসের ১৫ তারিখের পর থেকে পাকা শুরু হয়। চোষা, ফজলি, হিমসাগর আমও ওই সময় পাকতে শুরু করে। কিন্তু এ সকল আম অনেক আগেই বাজারে দেখা যায়। একই ভাবে গুটি আম, বোম্বাই, গোপালভোগ, লক্ষণভোগ জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি থেকে বাজারে আসার কথা। কিন্তু সেসব আমও বৈশাখ মাসে রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরে পাওয়া যায়। ক্রেতাদের মনে রাখতে হবে, অমৌসুমে এসব আম স্বাভাবিকভাবে পাকে না। এতে যে বিষাক্ত কেমিক্যাল ও ফরমালিন রয়েছে তা শতভাগ নিশ্চিত। তিনি ক্রেতাদের আম কেনার ক্ষেত্রে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।

মহাখালীর ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. গোলাম মোস্তফাও ইত্তেফাককে জানান, 'সায়ানাইড' দিয়ে আম পাকানো হয়। দীর্ঘদিন রেখে বিক্রির জন্য সে আমে মেশানো হয় ফরমালিন। এই দুটি কেমিক্যালেই মানবদেহে মরণব্যাধি ক্যান্সার হওয়ার আশংকা শতভাগ। দেশে ক্যান্সার রোগ আশংকাজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে বিষাক্ত আমসহ অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী দায়ী। ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপুল সংখ্যক রোগী চিকিত্সার জন্য আসেন। তা সামাল দেয়া চিকিত্সকদের পক্ষে দুঃসাধ্য হয়ে পড়ছে বলে তিনি জানান।

আম পাকাতে প্রয়োগ হচ্ছে ভারতীয় বিষ

সপ্তাহব্যাপী মেহেরপুর জেলায় কয়েকটি বাগান ও বাজার ঘুরে আম পাকানোর বিভিন্ন কেমিক্যাল এর সন্ধান পাওয়া গেছে। যেগুলো সীমান্তের ওপার থেকে সীমান্ত রক্ষীদের বকশিশ দিয়ে অধিক মুনাফার লোভে চোরাচালানীরা প্রতিদিন নিয়ে আসছে। তা দ্রুত চলে যাচ্ছে আম ব্যবসায়ী ও বাগান মালিকদের হাতে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সদর উপজেলার আমঝুপী ইউনিয়নের এক বাগান মালিক বলেন, প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং চাঁদাবাজদের অত্যাচারে আম পাকার আগেই তা পেড়ে ফেলতে হচ্ছে। তাই আম পাকানোতে ব্যবহার করা হচ্ছে ভারতীয় বিষ ইতোফোন গ্রুপের রাইজার, হারভেস্ট, প্রমোড ও ক্রমপমেক্স। অন্যদিকে মুজিবনগর উপজেলার কেদারগঞ্জের এক বাগান মালিক বলেন, ফুল ও ফল অধিক পরিমাণে গাছে আনতে ভারতীয় কিছু কেমিক্যাল ব্যবহার করতাম কিন্তু অধিক মুনাফার জন্য এখন সেগুলোই আম ও লিচু পাকানোতে ব্যবহার করছি। তাতে লাল টুকটুকে রং চলে আসছে যদিও ভিতরে ফলের কিছুটা অংশ কাঁচা থেকে যাচ্ছে।

মেহেরপুরের বড় বাজারের এক ফল ব্যবসায়ী বলেন, মসজিদ-মন্দিরের কমিটির লোকেরা যখন ভাল মন্দের হিসাব ঠিক রাখতে পারে না, তখন আমরা পরিবার বাঁচাতে ফলে এক আধ চামচ কি দিলাম সেই খোঁজ নিতে এসেছেন।

জানা গেছে, ভারতীয় বিষ ইতোফোন গ্রুপের ক্রমপমেক্স-এর চাহিদা প্রচুর। ১২০ থেকে ১৫০ টাকা মূল্যের এক বোতল বিষে ৪০/৬০ মণ আম পাকনো যায়। মেহেরপুর বামনপাড়ার এক কলা ব্যবসায়ী বলেন, আম কলা লিচুর রং আনতে ভারতীয় কিছু কেমিক্যাল ব্যবহার করে থাকি। কেননা রং এলে বাজারে ফলের চাহিদা বেড়ে যায়। আমে রাসায়নিক মেশানো সম্পর্কে স্থানীয় চিকিত্সক ডা. হিমাংশু পোদ্দার বলেন, কেমিক্যাল মেশানো ফলে মানবদেহে হতে পারে মারাত্মক ক্যান্সার। হতে পারে পেটের পীড়া, বয়ে বেড়াতে হতে পারে আজীবন চর্মরোগ।

নাটোরের লালপুর উপজেলায় আমের মুকুল বের হওয়া থেকে শুরু করে গাছ থেকে আম পাড়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত পোকার আক্রমণ, ছত্রাক রোধ ও আমের রং আকর্ষণীয় করার জন্য দফায় দফায় ব্যবহার করা হচ্ছে শ্যাম্পু ও নানা ধরনের বিষ।

আম ব্যবসায়ীরা জানান, মুকুল আসার আগে গাছের গোড়ায় সার প্রয়োগ ও প্রয়োজনে সেচ দেয়া হয় এবং পাতায় ম্যালথান গ্রুপের কীটনাশক কট, টিডো, ফাইটার ইত্যাদি স্প্রে করা হয়। গাছে মুকুল দেখা দিলে সামান্য কীটনাশকের সাথে ম্যানকোজের গ্রুপের ডায়াথেন অথবা কার্বন্ডাজিন গ্রুপের নইন পাওডার পানিতে গুলিয়ে স্প্রে করা হয়। তারপর আমের গুটি বড় হওয়া পর্যন্ত এনটাকল, নইন, ডায়াথেন, ব্যাপিস্টিন, ফ্লোরা, ফাইটার, টিডো ইত্যাদি ছত্রাক নাশক ও কীটনাশক স্প্রে করা হয়। আমের উপরের ময়লা পরিষ্কারের জন্য শ্যাম্পু, বোরন, ফলিকুর, রোব্রাল নামের তরল ওষুধ এবং গাছ থেকে আম পাড়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত ব্যবহার করা হচ্ছে নইন, টিডো, প্রিমিয়ার, এন্টাকল নামের বিষ। গোপালপুর বাজারের একজন কীটনাশক ব্যবসায়ী জানান, আম ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ গাছ থেকে আম পাড়ার পর দ্রুত পাকানোর কাজে ফ্লোরা নামের এক ধরনের ওষুধ ব্যবহার করছেন।

আম ব্যবসায়ী মোতালেব হোসেন জানান, আমের রং ভাল না হলে দাম পাওয়া যায় না তাই গাছ থেকে আম পাড়ার আগে এন্টাকল ও নইন নামের ওষুধ ব্যবহার করতে হয়। তবে তারা এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জানেন না বলে দাবি করেন।

ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ সৈয়দ আকরাম হোসাইন ইত্তেফাককে বলেন, বিষাক্ত কেমিক্যাল যুক্ত আম খাওয়ার পর শরীরের বিভিন্ন স্থানে সেই কেমিক্যাল জমা হয়ে থাকে। পরবর্তীতে তা ক্যান্সার সৃষ্টি করে। গর্ভবতী মায়েদের চিকিত্সকরাই ফল খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। সেই কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো ফল খাওয়ার পর গর্ভবতী মা ও তার পেটের সন্তান উভয়ের মরণব্যাধি ক্যান্সার হওয়ার আশংকা বেশি বলে তিনি জানান।

কিডনি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. হারুনুর রশিদ বলেন, মাত্রাতিরিক্ত কেমিক্যাল মেশানো আম খেলে কিডনি নষ্ট হওয়ার আশংকা বেশি। গর্ভবতী মা ও শিশুদের জন্য এই ফল খাওয়া সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলে তিনি জানান।

স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম বলেন, কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো আম খেলে নার্ভ দুর্বল হয়ে নিউরোপ্যাথি রোগ হওয়ার আশংকা বেশি। ওই সকল কেমিক্যালের টক্সিনের প্রভাব পড়ে নার্ভে। এর ফলে ব্রেইনে ও নার্ভের মারাত্মক ক্ষতি হয়। গর্ভবতী মা ওই ফল খেলে তার পেটের সন্তান বিকলাঙ্গ ও হাবাগোবা হওয়ার আশংকা থাকে। দেশে বিকলাঙ্গ শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার এটি অন্যতম কারণ বলে তিনি জানান।

এদিকে জানা গেছে, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে দেশের আমের চাহিদার ৮০ ভাগ উত্পাদন হয়ে থাকে। ওই দুটি জেলায়ও আম বাগানের মুকুল বের হওয়া থেকে শুরু করে আম গাছ হতে পাড়ার পূর্ব পর্যন্ত পোকার আক্রমণ, ছত্রাক রোধ ও আমের রং আকর্ষণীয় করতে, অপরিপক্ব অবস্থায় আম পাকাতে ও দীর্ঘদিন রেখে বিক্রির জন্য নানা ধরনের কেমিক্যাল দেয়া হয়।

রাজশাহী ফল গবেষণা ইন্সটিউিটের গবেষণা কর্মকর্তা ড. আব্দুল আলিম এ ব্যাপারে ইত্তেফাককে বলেন, আমে নানা ধরনের কীটনাশক, কেমিক্যাল বাগান মালিক ব্যবসায়ী ও আড়ত্ মালিকরা মেশান। প্রকৃত আম চাষীরা এ সম্পর্কে কিছুই জানেন না। পোকাও আমের জন্য অনেক উপকারী। সেই পোকাও তারা মেরে ফেলে। মৌমাছির মত পিরপিট, ব্লু-ফ্লাই ও হাউজ ফ্লাই জাতীয় পোকা আমের জন্য খুবই উপকারী বলে তিনি জানান।

প্রসঙ্গত চলতি বছর চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২৩ হাজার ৮৩০ হেক্টর জমিতে ১৮ লাখ গাছে আমের ফলন হয়েছে। উত্পাদনের টার্গেট ২ লাখ ১৫ হাজার মে.টন। এই জেলায় গত বছর ১ লাখ ৬৮ হাজার মে.টন আম উত্পাদন হয়েছিলো। অন্যদিকে বৃহত্তর রাজশাজীতে এবার ৫ লাখ মেট্রিক টন আম উত্পাদনের টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে। এই অঞ্চলে প্রায় অর্ধলাখ হেক্টর জমিতে আমের বাগান রয়েছে।

ফিরিয়ে দাও সে অরণ্য, লও এ নগর’- আর কিছুদিনের মধ্যে এভাবেই বলতে হবেসবাইকে। যেভাবে নগর জীবনের বিড়ম্বনা বাড়ছে তাতে এ কথা না বলে থাকার কোনোউপায় নেই। নগরে চলাফেরার নানা সমস্যার সঙ্গে যে বিষয়টা মানুষকে সবচেয়ে বেশিবিপদগ্রস্ত করছে তা হচ্ছে রাসায়নিক মিশ্রিত খাদ্য। এর ফলে প্রতিনিয়ত বেড়েচলেছে জীবনের ঝুঁকি। আগে বলা হতো কিসে ফরমালিন আছে। কি কি খাওয়া যাবে না।আর এখন পরিস্থিতি উল্টো। এখন জিজ্ঞেস করা হচ্ছে কিসে নেই ফরমালিন। একশ্রেণীর লোভীরা মানুষের জীবনের তোয়াক্কা না করে শুধু মুনাফার জন্য করেচলেছে বিজ্ঞানের অপব্যবহার। জীবনযাপনের ক্ষেত্রে আমাদের সবচেয়ে দরকারিখাদ্যপণ্যগুলোতেও হাত পড়েছে এ হায়েনাদের। রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে ফল, তরকারি, দুধের মতো প্রতিদিনের আবশ্যক খাবারগুলোকে জীবনের জন্য হুমকিতেরূপান্তরিত করেছে এরা। রাসায়নিক মিশ্রিত এসব খাবার খেয়ে অসুস্থ হচ্ছেমানুষ। ক্যান্সারের মতো জটিল রোগ চেপে বসছে কাঁধে। না খেয়ে থাকতে পারছে নামানুষ। তাই টাকা দিয়ে মৃত্যু কিনতে বাধ্য হচ্ছে সবাই।
দেশের সাধারণ আইনে খাদ্যে বিষ ও ভেজাল অপরাধ বিবেচিত হলেও এখন এটা হয়েগেছে সাধারণ ঘটনা। অপরাধের মাত্রা এত বেড়েছে যে তা নিয়মে পরিণত হয়েছে।মাঝেমাঝে সরকার এবং বেসরকারি কিছু সংগঠন এ নিয়ে তৎপরতা চালালেও পরিস্থিতিরতেমন কোনো উন্নতি নেই। খাবারে বিষ হিসেবে এখন সবচেয়ে বেশি কদর ফরমালিনের।ফরমালিন দিয়ে খাদ্যপণ্য পচনের হাত থেকে রক্ষা করেন ব্যবসায়ীরা। বাজারে আমযদি পাঁচ থেকে সাত দিন রাখতে হয় তাহলে তিন দফা ফরমালিন স্প্রে করা হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মিরপুরের একজন ফল ব্যবসায়ী এমনই তথ্য দিলেন। তিনিজানান, আম যখন গাছ থেকে পাড়া হয় তখনই একদফা ফরমালিন দেয়া হয়। এর পর এগুলোপ্যাকেট হয়ে শহরে আসে। শহরে এসে পৌঁছাতে দেরি হলেও যাতে পচন না ধরে তাইপ্রথম দফায় ওই ফরমালিন দেয়া হয়। পাইকাররা আমের ঝুড়ির মুখ খুলে কিংবা যদিদেখেন আম নরম তাহলে সব বের করে আরেক দফা ফরমালিন স্প্রে করেন। যাতে খুচরাদোকানগুলোতে পৌঁছানো পর্যন্ত আমের কোনো ক্ষতি না হয়। খুচরা দোকানিরা ওইঅবস্থায় আম বিক্রি শুরু করেন। আম নরম হলে খুচরা দোকানেও ফরমালিন স্প্রে করাহয় আরও কিছুদিন আম রক্ষা করার জন্য। গাছে পানি স্প্রে করার জন্য ব্যবহৃতকন্টেইনার দিয়েই এ কাজ সারা হয়। মোট তিন দফা স্প্রে হলে সাত দিনে আমের কিছুহয় না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিমাণ ফরমালিন স্প্রে করা হলে ওই আমগুলোতে২০ পিপিএমের ওপরে ফরমালিন পাওয়ার কথা। যা মানবদেহে উচ্চমাত্রার ক্ষতি ঘটাতেসক্ষম।

ফরমালিন কি
ফরমালিন  হচ্ছে রাসায়নিক উপাদান ফরমালডিহাইডের   জলীয়  মিশ্রণ।  এতেমিথানলও থাকে। ফরমালিন ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের প্রতিরোধক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।ফরমালডিহাইড মানবদেহে ক্যান্সার সৃষ্টিকারক ক্ষতিকর একটি রাসায়নিক যৌগ।চামড়া, টেক্সটাইল, মেলামাইন, পোলট্রি ও হ্যাচারি শিল্প, ল্যাবরেটরি, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, কাঠ ও প্লাইউড শিল্প, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফরমালিনব্যবহার হয়। বর্তমানে মৎস্য হ্যাচারিতে ফরমালিনের ব্যবহার বাড়ছে। এছাড়াঅ্যাগ্রো প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রি, সায়েন্টিফিক ল্যাব, ওষুধ কোম্পানি, ভ্যারাইটিজ কনজিউমার প্রডাক্ট, ট্রেডিং কোম্পানিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেফরমালিন ব্যবহার হচ্ছে। খাদ্যে ফরমালিন ছাড়াও আরও কিছু রাসায়নিক দ্রব্যব্যবহার হয়, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। এর মধ্যে আছে, ক্যালসিয়ামকার্বাইড, ইথেফেন, কাপড়ের রং, কীটনাশক হিসেবে এন্ড্রিন, ডিডিটি, হেপ্টাক্লোর ও কৃত্রিম ক্রমবৃদ্ধি নিয়ামক বা হাইব্রিড।

কোথায় নেই
সব ধরনের ফলই কৃত্রিম উপায়ে পাকাতে ব্যাপকভাবে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, কপারসালফেট, কার্বনের ধোঁয়া, পটাশের লিকুইড সলিউশন, কৃত্রিম ক্রমবৃদ্ধিনিয়ামকসহ বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে। ফল তাজা রাখতে বাড়তিব্যবহার করা হচ্ছে ফরমালিন। আম, কলা, খেজুর, পেঁপে, আনারস, মালটা, আপেল, আঙ্গুর এবং অন্যান্য ফলে ব্যবহৃত হচ্ছে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, কীটনাশক, ইথেফেন, ফরমালিন, কৃত্রিম ক্রমবৃদ্ধি নিয়ামক। মাছে ও টমেটোতে ফরমালিন, শাকসবজিতে কীটনাশক ও ফরমালিন, শুঁটকিতে ডিডিটি ব্যবহার করা হচ্ছে। মিষ্টিতেকাপড়ের রং, আলকাতরা এবং কৃত্রিম মিষ্টিদায়ক ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি মুড়িও চিড়াতেও রাসায়নিক দ্রব্যাদি ব্যবহার করা হয়।

বিভিন্ন কোম্পানির উৎপাদিত প্যাকেটজাত খাদ্য যেমন ফলের রস, স্ন্যাক্সফুড, জ্যাম-জেলি, আচার-চাটনিতে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর রং ব্যবহার করা হয় এবংসেমাই ও নুডলসে ফরমালিন ব্যবহার করা হয়। দুধেও ফরমালিনের ব্যবহার হচ্ছে।এমনকি চালেও ব্যবহার হচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান। বরফের মধ্যে দেয়াহচ্ছে ফরমালিন। এতে করে বরফের মধ্যে রাখা মাছে আর আলাদা করে ফরমালিন দেয়ারপ্রয়োজন পড়ছে না।

ক্ষতিকর প্রভাব
খাদ্য ভেজালিকরণ উপাদানগুলো মানবদেহের নানা ক্ষতির কারণ। বিষাক্ত রাসায়নিকমিশ্রিত খাবার ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। মাছ, ফল, মাংস এবং দুধেফরমালিন প্রয়োগের ফলে ক্যান্সার, বাল্য হাঁপানি এবং চর্ম রোগ হয়। শিশু ওগর্ভবতী মায়েদের জন্য এর ক্ষতিকর প্রভাব মারাত্মক। অতি স্বল্প পরিমাণফরমালডিহাইড গ্যাস ব্যবহারেও ব্রঙ্কাইটিস এবং নিউমোনিয়া হয়। শ্বাসের সঙ্গেএই গ্যাস গ্রহণ নিউমোনিয়ার সংক্রমণের কারণ। ফরমালিন সেই বিরল বিষাক্তরাসায়নিক পদার্থ যা গ্রহণের ফলে মানুষের তাৎক্ষণিক মৃত্যু হতে পারে। অনেকেইএখন এসব রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এর ফলে ভুক্তভোগীদের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহনকরতে গিয়ে তাদের পরিবার-পরিজন সর্বস্বান্ত হচ্ছে। তাছাড়া রাষ্ট্রকেস্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ খরচ করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ ক্যান্সার হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক  ডা. এম এ হাই এ প্রসঙ্গেবলেন, ‘মানবদেহে নানা ধরনের ক্যান্সার হয়ে থাকে। এগুলোর অনেক কারণ স্পষ্টজানাও যায়নি। তবে ফরমালিনের মতো বিষাক্ত রাসায়নিক যে ক্যান্সারের বিস্তারঘটাতে সক্ষম তা প্রমাণিত। ফরমালিনযুক্ত খাবার পাকস্থলীতে ক্ষতিকর প্রভাবফেলে। মানুষের শরীরে যা ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এতে পাকস্থলীতেপ্রদাহ, লিভারের ক্ষতি, অস্থিমজ্জা জমে যায়। যা গ্যাস্ট্রিক ও পরবর্তীতেক্যান্সার এর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গলায় ক্যান্সার ও রক্ত ক্যান্সারের মতোঘটনাও এ থেকে ঘটতে পারে। সরকারের উচিত খাদ্যপণ্যে ফরমালিন ব্যবহার যে কোনোমূল্যে নিষিদ্ধ করা।’
ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্স অন ক্যান্সারের ওয়ার্ল্ড ক্যান্সাররিপোর্টের দেয়া তথ্যমতে,  ১৯৭৫ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপীক্যান্সারের হার দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২০ সালের মধ্যে তা আবারও দ্বিগুণ হবে এবংএ হার তিনগুণে পৌঁছবে ২০৩০ সালের মধ্যে। সারা বিশ্বে প্রতি বছর ১.৩ শতাংশহারে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়ে চলেছে। তবে বাংলাদেশ, ভারত, চীন, পাকিস্তান, ভুটানের মতো দেশগুলোয় ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাবৃদ্ধির হার ২.৮ শতাংশ। সংস্থাটি বলছে, শিল্পোন্নত দেশের তুলনায় আমাদের মতোমধ্য ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা বেশি দেখাযাচ্ছে। এক্ষেত্রে তামাকজাত দ্রব্য অধিকমাত্রায় গ্রহণ, উচ্চমানেরচর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ এবং খাদ্যে ও বায়ুতে নানা ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিকেরউপস্থিতিকে দায়ী করা হয়েছে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন বাংলাদেশ কনজুমার রাইটস সোসাইটির দেয়া তথ্যমতে, ভেজালখাদ্য খেয়ে দেশে প্রতি বছর তিন লাখের বেশি মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্তহচ্ছে। প্রায় দেড় লাখ মানুষ ডায়াবেটিস ও ২ লাখ কিডনি  রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশু ও গর্ভবতীরা। ভেজালের কারণে গর্ভবতীমায়ের শারীরিক জটিলতাসহ প্রতি বছর গর্ভজাত বিকলাঙ্গ শিশুর সংখ্যা কয়েক লাখ।

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারকন্টিনেন্টাল মার্কেটিং সার্ভিসেস এরগবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্যান্সার প্রতিরোধক ঔষধের বাজার প্রতি বছর শতকরা ২০ভাগ হারে বাড়ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের ডিন অধ্যাপক    এবিএম  ফারুক  বলেন, ‘ফরমালিন এতটাই ক্ষতিকর যে, শুধু প্রতিরক্ষামূলক পোশাক যেমন গ্লাভসপরিধানের মাধ্যমে এটা ব্যবহার করতে হয়। বায়ু চলাচলপূর্ণ এলাকায় মুখ বন্ধপাত্রে এটি সংরক্ষণ করা উচিত। এর থেকে উৎপন্ন ধোঁয়া চোখ ও শ্বাসযন্ত্রেরপ্রদাহ সৃষ্টি করে। এই জিনিস যদি ফলের সঙ্গে মানবদেহে প্রবেশ করে তাহলেফলের গুণাবলি দূরে থাক শরীর তার স্বাভাবিক কাজ করার ক্ষমতা হারাবে।’

নানা ধরনের বিষাক্ত ও নিম্নমানের খাদ্যের কারণে আগামী প্রজন্ম বিভিন্নগুরুতর অসুখের ঝুঁকি নিয়ে বড় হচ্ছে। এসব খাদ্য গ্রহণে শিশুর মৃত্যুঝুঁকিরয়েছে। কিছু খাবার এমনই বিষাক্ত যে তা ডিএনএকে পর্যন্ত বদলে দিতে পারে।চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের মতে এসবের প্রভাবে শিশুর ডায়রিয়া থেকে শুরু করেফুসফুসের সংক্রমণ, কিডনি ও লিভার পচে যাওয়া, রক্ত সরবরাহ বিঘিœত হওয়া, অন্ধহয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে। ইথেফেনের কারণে ফলের পুষ্টিমান ২০-৩০শতাংশ এবং ক্যালসিয়াম কার্বাইডের কারণে তা ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।

কার্বাইড দিয়ে পাকানো ফল স্বাস্থ্যের নার্ভাস সিস্টেমের জন্য অত্যন্তক্ষতিকর। কার্বাইড থেকে উৎপন্ন অ্যাসিটিলিন মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহহ্রাস করে। তীব্র পর্যায়ে এটা মাথাব্যথা, ঘূর্ণিরোগ, মাথা ঘোরা, প্রলাপ এবংএমনকি কোমার কারণ হতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে এটা মেজাজ খিটখিটে এবংস্মরণশক্তির ক্ষতি করতে পারে। এগুলো মিশ্রিত খাবার গ্রহণের পরপরই পেটেব্যথা, বমি ও পাতলা পায়খানা হতে পারে।

শিল্প গ্রেড ক্যালসিয়াম কার্বাইডে পরিমাণে কম হলেও অধিকতর বিষাক্ত আরসেনিকও ফসফরাস রয়েছে যা সুস্থ ফলকে বিষময় ফলে রূপান্তর করে। ক্যালসিয়ামকার্বাইডের ফলে কিডনি, লিভার, ত্বক, মূত্রথলি এবং ফুসফুসে ক্যান্সার হতেপারে। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারও ক্ষতির কারণ হচ্ছে। কীটনাশকব্যবহারের একটি নির্দিষ্ট সময় পর শস্য বা ফল বাজারে নেয়ার কথা থাকলেও সেপর্যন্ত অপেক্ষা করা হয় না। ২০১২ সালে দিনাজপুরে লিচু খেয়ে ১৩ শিশুরমৃত্যুর কারণ ছিল কীটনাশক।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন ইউনিটের ডিনঅধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমরা ফলফলাদি গ্রহণ করি শরীরের নানাধরনের ক্ষয় পূরণের জন্য। কিন্তু ফরমালিন মিশ্রিত ফল বরং আরও নতুন ক্ষয়েরকারণ হয়ে দাঁড়ায়- যা মানবদেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।একজন চিকিৎসাবিদ হিসেবে আমি এখন নিরুপায় হয়ে সবাইকে পরামর্শ দেই সব ধরনেরবাজারি ফল এড়িয়ে চলুন। নিজের বাড়িতে কিছু হলে খান। অথবা বাদ দেন। যদিও আমিবুঝি এটা আমাদের আগত শিশু ও নতুন প্রজন্মের জন্য খুব ক্ষতিকর। এতে আয়ুষ্কালকমবে, দুর্বলতা বাড়বে, মেধার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে। কিন্তু মৃত্যু আমদানিরচেয়ে ক্ষতির মধ্যে বসবাস করাকে আমি শ্রেয় মনে করি। যতদিন সরকারফরমালিনমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করতে না পারবে ততদিন এই ক্ষতি মেনে নিতে হবে।’

বিষ আসছে, বিক্রিও হচ্ছে
খাদ্যপণ্য উৎপাদনে এখন কীটনাশকের ব্যবহার গ্রহণযোগ্য। এসব কীটনাশকেরক্ষতিকর প্রভাব যাতে মানবদেহে না পড়ে তার জন্য কিছু নির্দেশনাও থাকে।কীটনাশক কি পরিমাণ ব্যবহার করা যাবে তার বাধ্যবাধকতা থাকে। কিন্তু সেগুলোমানা হয় না।

বাংলাদেশে ফরমালিন আমদানি হয় প্রধানত শিল্পখাতে ব্যবহার ও পরীক্ষাগারেব্যবহারের জন্য। শিল্পখাতে ফরমালিনের চাহিদা ৪০ থেকে ৫০ টন। কিন্তু গতঅর্থবছরে ২০৫ টন ফরমালিন আমদানি হয়েছে- যা চাহিদার তুলনায় চার গুণ বেশি।বাড়তি ফরমালিন খাদ্যে বিশেষ করে ফল-মূল, মাছ-মাংস, দুধ, সবজিতে ব্যবহারহচ্ছে এবং এ লক্ষ্যে একটি মহল মজুদ করছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর আগের বছর৫০০ টন ফরমালিন আমদানি হয়। তার আগের বছর ৩০০ টন।

ফরমালিনের ক্ষতি নিয়ে গণমাধ্যমে নানা ধরনের খবর প্রকাশ হওয়ায় সরকারসম্প্রতি ফরমালিন আমদানিতে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। প্রথমে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়বিধান করে যে, টিসিবি ছাড়া অন্য কেউ ফরমালিন আমদানি করতে পারবে না। কিন্তুনানা জটিলতায় টিসিবি কর্তৃক ফরমালিন আমদানি আটকে গেলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়েরঅনুমতি ছাড়া ফরমালিন আমদানির সুযোগ বন্ধ করা হয়েছে।

অনেকের মতে, সরকারের কড়াকড়ির কারণে অবৈধ পথে ফরমালিন আমদানি বেড়ে গেছে।কিন্তু বাজার সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলছেন, ভারতে থেকে ফরমালিন আমদানির গল্পএকেবারেই ভুয়া। ভারতেও ফরমালিনের   ব্যবহার    নিয়ে  কড়াকড়ি চলছে। বরং আগেদুই বছরে যে বিপুল পরিমাণ ফরমালিন আমদানি করা হয়েছিল তাই এখন বাজারে ঘুরেবেড়াচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় খোলা বাজারেই ফরমালিনবিক্রি হয়। পুরনো ঢাকার চকবাজার, মৌলভী বাজার, মিটফোর্ড এলাকায় পানিমিশ্রিত ফরমালিন পাওয়া যায় ৬০ টাকা লিটার দরে। বেচা বিক্রির এ কাজ হয় খুবগোপনে। পরিচিত, বিশ্বস্ত লোক ছাড়া বিক্রেতারা কাউকে ফরমালিন দেখান না।জিজ্ঞেস করলে বলেন, এগুলো কেমিক্যাল বিক্রির দোকানে পাওয়া যায়। এখানে পাওয়াযাবে না। তবে সূত্র নিশ্চিত করেছে এই এলাকা থেকেই পুরো ঢাকা অঞ্চলেরপ্রয়োজনীয় ফরমালিনের চাহিদার যোগান দেয়া হয়।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নিয়মিত প্রতি বছর বেশকিছুপ্রতিষ্ঠান ফরমালিন আমদানি করে। তবে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান আছে যারা এক বছরআমদানি করে তো অন্য বছর করে না। এ নিয়ে সরকারকে তদন্ত করার অনুরোধওজানিয়েছে বেশকিছু প্রতিষ্ঠান।

তবে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, দেশে যে পরিমাণ ফরমালিন ব্যবহার হয় বিদেশথেকে আমদানিকৃত ফলের মধ্যে তারচেয়ে অনেক বেশি ফরমালিন পাওয়া যায়।আমদানিকৃত পণ্যে ফরমালিন আছে কিনা তা তদারকির ক্ষেত্রে বড় ধরনের গাফিলতিকরা হয়। কোনো বন্দরেই ঠিকঠাক ফরমালিন শনাক্তকরণের ব্যবস্থা নেই। এ কারণেআমদানি করা প্রচুর খাদ্যপণ্যেও ফরমালিন ধরা পড়ছে।

ফল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেছে, তারা ফরমালিন দেয়াটাকে অপরাধ মনেকরে না। ফরমালিনের ক্ষয়ক্ষতিটাকে খুব বেশি বড় কিছু তারা মনে করে না।ব্যবসায়ীদের এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে যে অশিক্ষা যুক্ত তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মিরপুর ১০ নং গোলচক্কর এলাকার একজন ফল ব্যবসায়ীবলেন, ‘ফরমালিন হইল গিয়া উন্নত সাইন্স। একদম হাইব্রিডের মতো। এইটা দিলেই তোভালো। ফল মেলা দিন ভালো থাকে। তয় একটু আধটু ক্ষতি তো হয়ই। রাস্তায় নামলেবাতাসের মইধ্যেও বিষ থাকে। এইটা কোনো ব্যাপার না।’

অলস পরীক্ষাগার
খাদ্যে ফরমালিন বা অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিক আছে কিনা জানতে যেসবপরীক্ষাগারে যেতে হয় তার অধিকাংশই কোনো কাজে লাগছে না। আগ্রহী কেউ খাবারেরমান পরীক্ষা করাতে গেলে তাকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। সরকারের বিভিন্নপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব থাকলেও তারা নিজ উদ্যোগে খাবারের মান সংক্রান্ত কোনোপরীক্ষা নিরীক্ষা চালায় না।

বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি ল্যাবরেটরিজ খাদ্য বিশ্লেষণ কার্যকলাপের সঙ্গেজড়িত। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বিএসটিআই, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রণালয়ের অধীন জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, খাদ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রণালয়ের অধীন খাদ্য অধিদপ্তরের ল্যাবরেটরি, পরিবেশ দূষণ মনিটরিংয়েরজন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের ল্যাবরেটরি, রপ্তানিকৃত মাছের অ্যান্টিবায়োটিক, মাদক অবশিষ্টাংশ ও মাইক্রোবিয়াল দূষণ মনিটরিংয়ের জন্য মৎস্য অধিদপ্তরেরমৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ ল্যাবরেটরি, পশু রোগ পরীক্ষা এবং পশু ড্রাগও পোল্ট্রি ফিড নিয়ন্ত্রণের জন্য পশুসম্পদ বিভাগের ল্যাবরেটরি, কৃষি কাজেব্যবহৃত আমদানি ও রপ্তানিকৃত গাছপালা এবং সবজির মনিটরিংয়ের জন্য কৃষিসম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইংয়ের ল্যাবরেটরি, পানির গুণগতমনিটরিংয়ের জন্য জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ল্যাবরেটরি।

আমদানিকৃত খাদ্যে তেজস্ক্রিয়তা মনিটরিংয়ের জন্য বাংলাদেশ আণবিক শক্তিকমিশনের স্বাস্থ্য পদার্থ বিজ্ঞান ল্যাবরেটরি, লবণে আয়োডিনের পরিমাণমনিটরিংয়ের জন্য জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ল্যাবরেটরি, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ওশিল্প গবেষণা পরিষদের গবেষণাধর্মী খাদ্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট।ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরেরও নিজস্ব পরীক্ষাগার আছে। এছাড়া বিশ্বখাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সহায়তায় সরকার ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে খাদ্যেরাসায়নিকের পরিমাণ চিহ্নিত করার একটি পরীক্ষাগার স্থাপন করেছে। যা ২০১২সালের অক্টোবর মাসে স্বাস্থ্যমন্ত্রী উদ্বোধন করেছেন। কিন্তু জনবল নিয়োগ নাহওয়ায় পরীক্ষাগারটি এখনও চালু হয়নি।

এসব সংস্থার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তারা নিজ উদ্যোগে কখনোই খাদ্যপণ্যের মানপরীক্ষা করে সরকার বা জনগণকে অবহিত করে না। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর গবেষণা চালিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তারাবিভিন্ন খাদ্যপণ্যের ওপর পরীক্ষা চালিয়েছে নিজ উদ্যোগে। এ প্রসঙ্গে পবারসম্পাদক প্রকৌশলী মো. আবদুস সোবহান বলেন, ‘মূল সমস্যা হচ্ছে, এপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যারা কাজ করছেন তাদের অতখানি আন্তরিকতা নেই। তারা উদ্যোগীহয়ে কাজগুলো করলে এ নিয়ে সচেতনতা তৈরি হতো। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যেসমন্বয়ের অভাব রয়েছে। অনেকের কাছেই যেসব যন্ত্রপাতি রয়েছে তা যথেষ্ট না।আবার যাদের কাছে যন্ত্রপাতি আছে তা তারা ঠিকমতো ব্যবহার করছে না। আমাদেরগবেষণায় বেরিয়ে এসেছে, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন আমেরিকার তৈরিফরমালডিহাইড মিটার জেড ৩০ এর সাহায্যে মাছ, ফল, সবজিসহ সকল দ্রব্যে ফরমালিনশনাক্ত করে। ১৯ জুন ২০১৩ তারিখে ডিএনসিসির আওতাভুক্ত ৩৪টি মার্কেটে ২৩৮টিমাছে ফরমালিন শনাক্তকরণ কীট (বিসিএসআইআর হতে ক্রয়কৃত) বিনা মূল্যে বিতরণকরেছে। এসব মিটার আবার ৫ পিপিএমের কম ফরমালিন থাকলে তা আর ধরতে পারে না।

অথচ আইনে বলা আছে খাদ্যে ফরমালিন মেশানোটাই অবৈধ। সুতরাং এই মেশিন ব্যবহারকরাটাও আইনের লঙ্ঘনের মধ্যে পড়ে। কারণ এটা ৫ পিপিএমের নিচে থাকা ফরমালিনকেধরে না। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের এ সংক্রান্ত পরীক্ষার সুযোগ-সুবিধানেই। বিএসটিআই শুধু ফলমূলে ফরমালিনের উপস্থিতি পরীক্ষা করে। কৃষিসম্প্রসারণ অধিদপ্তরেরও ফল, শাকসবজি, মাছ, দুধ ও মিষ্টিতে রাসায়নিকদ্রব্যাদি পরীক্ষার সুযোগ-সুবিধা নেই। এই নেই নেই এর ভিড়ে যা আছে তারও কোনোব্যবহার হয় না। পরীক্ষাগারগুলোর সক্ষমতা পর্যালোচনা করে এদের দায়িত্ব দিয়েখাদ্য পরীক্ষায় নামানোর উদ্যোগ নেয়া দরকার।

খাদ্যে বিষ দেয়া নিয়ন্ত্রণ করতে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেপরিবেশ অধিদপ্তর। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ এ জনস্বাস্থ্যের প্রতিক্ষতিকারক, অহিতকর বা ধ্বংসাত্মক কার্যকে ‘দূষণ’ এর সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্তকরা হয়েছে। খাদ্যে রাসায়নিক মেশানোটা এর মধ্যে পড়ে। পরিবেশ আইনে এদেরবিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে সবচেয়ে বেশি শাস্তি দেয়া যেত। পরিবেশ অধিদপ্তরকে একাজে নামাতে হবে। পরিবেশ আইনকে এ কাজে ব্যবহার করতে হবে।’

আইনের প্রয়োগ নেই
ফরমালিন বা খাদ্যপণ্যে ব্যবহৃত অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিকের ক্ষেত্রেবিদ্যমান আইনে নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা এবং শাস্তির বিধান আছে। তা সত্ত্বেওএর ব্যবহার কমছে না। সংশ্লিষ্টরা এজন্য আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবকেই দায়ীকরছেন। নিরাপদ খাবারতৈরি, বিপণন ও বিক্রি এবং জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষানিশ্চিত করার জন্য বেশ কটি আইন রয়েছে। অত্যাবশ্যকীয় পণ্য নিয়ন্ত্রণ আইন১৯৫৬, বিএসটিআই (সংশোধিত) আইন ২০০৩, নিরাপদ খাদ্য (সংশোধিত) আইন ২০০৫, মোবাইল কোর্ট অর্ডিনেন্স ২০০৯, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯।

২ জুলাই ২০১৩ মন্ত্রিসভা নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ (খসড়া) অনুমোদন করেছে। এআইন বাস্তবায়ন করবে খাদ্য মন্ত্রণালয়। বাস্তবায়নের জন্য আলাদা কর্তৃপক্ষগঠন করা হবে। কিন্তু ভেজালবিরোধী বা খাদ্যে রাসায়নিকের ব্যবহারের বিরুদ্ধেকার্যক্রম পরিচালনাকারী অন্য সরকারি সংস্থা ও পরীক্ষাগারগুলোর সঙ্গে নতুনএই কর্তৃপক্ষের কাজের সমন্বয় কীভাবে হবে, তা আইনে উল্লেখ করা হয়নি। নিরাপদখাদ্য (সংশোধিত) আইন ২০০৫ দিয়েই এখনো কাজ চলছে। এই আইনে মানবস্বাস্থ্যেরজন্য ক্ষতিকর বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য যেমন ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ফরমালিন, কীটনাশক (ডিডিটি, পিসিবি তেল) বা বিষাক্ত রং খাদ্যে ব্যবহার এবং ক্ষতিকরবিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য যেমন ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ফরমালিন, কীটনাশক (ডিডিটি, পিসিবি তেল) বা বিষাক্ত রং মিশানো খাদ্য বিক্রি নিষিদ্ধ করাহয়েছে। এ আইনে প্রতিটি জেলা এবং মেট্রোপলিটন এলাকায় এক বা একাধিক বিশুদ্ধখাদ্য আদালত স্থাপনের বিধান রয়েছে।

ভোক্তা  অধিকার   সংরক্ষণ   আইন, ২০০৯ এর ৪২ ধারা অনুযায়ী মানুষের জীবন বাস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক কোনো দ্রব্য, কোনো খাদ্যপণ্যের সঙ্গে মিশ্রণনিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ আইন অনুযায়ী কেউ এসব দ্রব্য খাদ্যপণ্যের সঙ্গেমিশ্রিত করলে অনূর্ধ্ব তিন বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক দুই লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ৩, ৪ ও ৯ জুন ২০১৩ তারিখের প্রেস রিলিজহতে দেখা যায়, ৩ তারিখে ঢাকার শান্তিনগর, মৌচাক ও সিদ্ধেশ্বরী, ৪ তারিখেধানমণ্ডি, কলাবাগান ও পান্থপথ এবং ৯ তারিখে কাওরানবাজার ও ফকিরেরপুল এলাকায়অভিযান চালিয়ে ফলে ফরমালিনের উপস্থিতির জন্য যথাক্রমে ৫টি দোকানকে ৮০হাজার টাকা (একজনকে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা), ৫টি দোকানকে ১ লাখ ১৮ হাজারটাকা (একজনকে সর্বোচ্চ ৪৫ হাজার টাকা) এবং ৫টি দোকানকে ৬৫ হাজার টাকা (একজনকে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা) জরিমানা করা হয়। এ থেকে স্পষ্ট হয়, আইনেথাকা সর্বোচ্চ শাস্তি অপরাধীদের দেয়া হয়নি। কিন্তু সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়াহলে এক্ষেত্রে সচেতনতা বাড়ত এবং অপরাধীরাও এ ধরনের অপরাধ থেকে নিজেদের দূরেরাখত।

বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্যাদি দিয়ে ফল পাকানো ও সংরক্ষণ এবং সেগুলো বিক্রিকরার দায়ে অপরাধীদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে ক্রিমিনাল মামলা দায়েরেরজন্য উচ্চ আদালত ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০১২ পুলিশকে আদেশ দিয়েছেন। উচ্চ আদালত ২০১০সালে বাণিজ্য, খাদ্য ও স্বরাষ্ট্র সচিবকে একটি কমিটি গঠন করে  ফলেরাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার বন্ধে সরকারকে সুপারিশ করা এবং ১৫ দিনের মধ্যেআদালতে একটি প্রতিবেদন জমা দিতে বলেন। যা আজও দেয়া হয়নি।

উচ্চ আদালতের এ সংক্রান্ত আরও কিছু নির্দেশনা আছে। আদালত ২ বছরের মধ্যেসকল জেলায় খাদ্য আদালত স্থাপন এবং পর্যাপ্ত খাদ্য পর্যবেক্ষক নিয়োগের জন্যসরকারকে ০১ জুন ২০০৯ নির্দেশ প্রদান করেন। রাজস্ব বোর্ড এবং শুল্ক বিভাগকেআদেশ প্রদান করেন যে, স্থল ও সমুদ্রবন্দর দিয়ে আমদানিকৃত ফল পরীক্ষা করেদেখতে সেগুলো রাসায়নিক দ্রব্যমুক্ত কিনা। আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেছেন, রাসায়নিক দিয়ে ফল পাকানো ও সংরক্ষণে রাসায়নিক দ্রব্যাদির ব্যবহার অবৈধ।বিএসটিআই ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ভেজাল ফল বিক্রি বা গুদামজাত প্রতিরোধেসারা দেশে ফলের গুদামে ক্রমাগত অভিযান চালানোর নির্দেশনাও আদালত দিয়েছেন।  কিন্তু এর তেমন কোনো সুফল আসেনি সংশ্লিষ্টদের গা ছাড়া মনোভাবের কারণে।

প্রশ্ন করলে স্বাস্থ্য সচিব এম এম নিয়াজউদ্দিন বলেন, ‘ফরমালিন ও অন্যান্যযেসব রাসায়নিক খাদ্যপণ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে এটা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।আমরা নানা ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছি। সরকারের অন্য মন্ত্রণালয়গুলোকে বিভিন্নসময় চিঠি দিয়ে উদ্বুদ্ধ করেছি পদক্ষেপ নেয়ার জন্য। সরকার এখন একটি ভালোমানের ল্যাবরেটরি তৈরি করেছে। এটাও হয়েছে আমাদের চেষ্টার ফলে। এটাকে আমরাচ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। এর প্রতিকার ও প্রতিরোধ দুটোর জন্যই কাজ করেযাচ্ছি।’

সরকারের পদক্ষেপ
খাদ্যে ভেজাল নিয়ন্ত্রণের জন্য ৪ বছরেরও বেশি সময় আগে দেয়া হাইকোর্টেরনির্দেশের প্রেক্ষিতে প্রতি জেলায় খাদ্য আদালত স্থাপন এবং খাদ্য পর্যবেক্ষকনিয়োগের ক্ষেত্রে সরকার কর্তৃক কার্যকর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু আলম মোঃ শহীদ খানকে এ বিষয়ে প্রশ্নকরা হলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আগেও একাধিকবার বলেছি। আমার অভিজ্ঞতায় আমি যাবুঝি, এটা বিচার বিভাগই করবে। নির্বাহী বিভাগ এখন বিচার বিভাগ থেকে আলাদা।’
কিন্তু এ সমন্বয়ের উদ্যোগটা তো আপনারা নিতে পারেন। মানুষ তোমৃত্যুঝুঁকিতে! এমন প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, ‘আদালত প্রতি জেলায় খাদ্যআদালত স্থাপন এবং খাদ্য পর্যবেক্ষক নিয়োগের জন্য দুই বছর সময় দিয়েছিল।কিন্তু কাজটা বিশাল। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জায়গায় এটা আটকে আছে বলে আমারমনে হয়। এক্ষেত্রে আমাদের খুব বেশি কিছু করণীয় নেই। মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তহলেই কাজ এগুবে। তবে এটা না হলেও আরও কাজ চলছে। ২০১৫ সালের মধ্যে ঢাকা ওচট্টগ্রামে খাদ্য পরীক্ষা ল্যাবরেটরি স্থাপনের লক্ষ্যে আমরা একটা বৃহৎপ্রকল্প গ্রহণ করেছি। ঢাকার ল্যাবরেটরির কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। দ্রুতই তাচালু হবে।’

 খাদ্যে ভেজাল নিয়ন্ত্রণে মাঠ পর্যায়ে ভূমিকা রাখে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণঅধিদপ্তর। এখান থেকেই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। যোগাযোগ করা হলে  সংস্থাটির  মহাপরিচালক  আবুল হোসেন মিঞা নানা অভিযোগ দিয়ে আলাপ শুরু করেন।তিনি বলেন, ‘২০১০ সালের ৬ এপ্রিল জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরপ্রতিষ্ঠা করা হয়। এতদিনেও এখানে পর্যাপ্ত লোকবল দেয়া হয়নি। এটাই একমাত্রপ্রতিষ্ঠান, যা জন্মের আগে থেকে কাজ করছে। ২০০৯ সালের ২৪ নভেম্বর ২৯সদস্যের কাউন্সিল গঠনের পর থেকেই এর কার্যক্রম শুরু হয়। ১০১টি অফিসারেরপদসহ ২২৩টি পদ সৃষ্টি করেই ২০০৯ সালে মহাপরিচালক হিসেবে আমাকে নিয়োগ দেয়াহয়। কিন্তু কাজ করার মতো লোকবল এখনো পাইনি। এ পর্যন্ত মাত্র সাতজনকর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে। সারাদেশে ৭২টি অফিসের মধ্যে ঢাকার বাইরে আটটিঅফিস চালু করা গেছে। এ জনবল দিয়ে পারা যায় না। আর যা কাজ আমরা করছি, তাওগণমাধ্যমগুলো প্রচার করে না। আমাদের ওয়েবসাইটে তথ্য দেখেন, আর পত্রিকাগুলোমিলিয়ে দেখেন। শাস্তির খবরগুলো বড় করে প্রচার হলে অন্যরা ভয় পেতো। ভোক্তাঅধিকার আইনেরও প্রচার হওয়া দরকার। এ সম্পর্কে খুব কম মানুষই জানে।’

কিন্তু আপনারাই তো আইন অনুযায়ী শাস্তি দেন না। শাস্তি কম দেন! এমনপ্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যিনি দায়িত্বে থাকেন তিনি আইনের লোক। আইন বুঝেইশাস্তি দেন। আমরা তো তাকে বলে দিতে পারি না কি শাস্তি দিবেন। তাছাড়া অনেকক্ষেত্রেই খুচরা বিক্রেতারা আমাদের হাতে পড়েন। যদিও দোষটা তাদের কম থাকে।আবার এই খুচরা বিক্রেতাদের সামর্থ্যও কম থাকে। অনেক কিছু বিবেচনা করেই এধরনের শাস্তি দেয়া হয়।

এসেছে বর্ষা, তবু আমাদের চারপাশ থেকে মধু মাস জৈষ্ঠের মৌ মৌ গন্ধ যায়নি। বাজারে এখনও রয়েছে সুমিষ্ট ফল আম, কাঁঠাল, লিচু, জামসহ প্রভৃতি রসালো ফল। এর মধ্যে ফল রসিকদের কাছে সবচেয়ে পছন্দের ও প্রিয় ফলটি হলো আম।
 কিন্তু এখন বাজারে পাওয়া আমের মধ্যে অধিকাংশের মধ্যেই ব্যবহার করা হয় ফরমালিন ও কার্বাইড নামের রাসায়নিক পদার্থ। মূলত আমকে সঠিক সময়ের আগে পাকানো, আকর্শণীয় রঙ ও বেশিদিন পচন রোধ করার জন্যই এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী প্রকৃতির এই অনন্য ফলটিকে বিষাক্ত করে তুলছে। যা খেয়ে কিডনিসহ বিভিন্ন প্রাণঘাতি রোগ ছড়াচ্ছে মানুষের মধ্যে।
 এরপরও বাজারে চাইলে দেখে কেনা যায় ফরমালিন ও কার্বাইডমুক্ত আম। তবে তা চেনার জন্য কিছু নিয়ম রয়েছে।

ফরমালিন বা কার্বাইড দেয়া আম কি করে চিনবেন?
 ১. প্রথমেই লক্ষ্য করুন যে আমের গায়ে মাছি বসছে কি না। কেননা ফরমালিনযুক্ত আমে মাছি বসবে না।
 ২. আম গাছে থাকা অবস্থায় বা গাছ পাকা আম হলে লক্ষ্য করে দেখবেন যে আমের শরীরে এক রকম সাদাটে ভাব থাকে। কিন্তু ফরমালিন বা অন্য রাসায়নিকে চুবানো আম হবে ঝকঝকে সুন্দর।
 ৩. কারবাইড বা অন্য কিছু দিয়ে পাকানো আমের শরীর হয় মোলায়েম ও দাগহীন। কেননা আমগুলো কাঁচা অবস্থাতেই পেড়ে ফেলে ওষুধ দিয়ে পাকানো হয়। গাছপাকা আমের ত্বকে দাগ পড়বেই।
 ৪. গাছপাকা আমের ত্বকের রঙে ভিন্নতা থাকবে। গোঁড়ার দিকে গাঢ় রঙ হবে, সেটাই স্বাভাবিক। কারবাইড দেয়া আমের আগাগোড়া হলদেটে হয়ে যায়, কখনও কখনও বেশি দেয়া হলে সাদাটেও হয়ে যায়।
 ৫. হিমসাগর ছাড়া আরও নানা জাতের আম আছে যারা পাকলেও সবুজ থাকে, কিন্তু অত্যন্ত মিষ্টি হয়। গাছপাকা হলে এইসব আমের ত্বকে বিচ্ছিরি দাগ পড়ে। ওষুধ দিয়ে পাকানো হলে আমের শরীর হয় মসৃণ ও সুন্দর।
 ৬. আম নাকের কাছে নিয়ে ভালো করে শুঁকে কিনুন। গাছ পাকা আম হলে অবশ্যই বোটার কাছে ঘ্রাণ থাকবে। ওষুধ দেয়া আম হলে কোনও গন্ধ থাকবে না, কিংবা বিচ্ছিরি বাজে গন্ধ থাকবে।
 ৭. আম মুখে দেয়ার পর যদি দেখেন যে কোনও সৌরভ নেই, কিংবা আমে টক/ মিষ্টি কোনও স্বাদই নেই, বুঝবেন যে আমে ওষুধ দেয়া।
 ৮. আম কেনা হলে কিছুক্ষণ রেখে দিন। এমন কোথাও রাখুন যেখানে বাতাস চলাচল করে না। গাছ পাকা আম হলে গন্ধে মৌ মৌ করে চারপাশ। ওষুধ দেয়া আমে এই মিষ্টি গন্ধ হবেই না।

  •  Start 
  •  Prev 
  •  1 
  •  2 
  •  3 
  •  4 
  •  5 
  •  Next 
  •  End