x 
Empty Product

আম সারা পৃথিবীতে ফলের রাজা-রাজকীয় ফল। ভারত ও বাংলাদেশে আম অমৃত ফল। কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত আমকে ‘বাংলার রসাল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আমগাছ যেমন সুদর্শন ও দৃষ্টিনন্দন, তেমনি ফল হিসেবেও আম সুদর্শন ও বাহারি বর্ণের। আম ফলের যে বাহারি বর্ণ লক্ষ্য করি তা দেখে মনে হয় সৃষ্টিকর্তা নিজ হাতে এইসব বাহারি বর্ণ তৈরি করেছেন। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়— ‘আমের যে বর্ণ মাধুরী তা জীববিধাতার প্রেরণায় আমের অন্ত্মর থেকে উদ্ভাসিত।’

কচি আম থেকে পাকা আম পর্যন্ত্ম থোকায় থোকায় গাছে ঝুলে থাকা আম সকলকে আকৃষ্ঠ করে। অবাক নয়নে চেয়ে থাকে পথিক আমবাগানের দিকে। আমের মত আকর্ষণীয় ফল গোটা পৃথিবীতে নেই। আম সকলকে কাছে টানে। তাই আম নিয়ে কত স্মৃতি কথা, গল্প, কবিতা ও গান রচিত হয়েছে। আমাদের বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে আম।

পৃথিবীর ৮৫টিরও বেশি দেশে আম উত্পাদিত হয়। আমগাছের আদিভূমি বাংলাদেশ ও ভারত থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে আমবাগান সৃষ্টি ও আম উত্পাদন ছাড়িয়ে দেয়ার পেছনে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, আরব, বাণক, ইসলাম ধর্ম-প্রচারক, খ্রিস্টান মিশনারি, পুর্তগীজ ও পারশিয়ানদের অবদান বেশি। পৃথিবীতে আমবাগান সৃষ্টির চমকপ্রদ ইতিহাস রয়েছে। বৌদ্ধদের ধ্যানের জন্য আমগাছ ছিল অতি প্রয়োজন। তাই বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা তাদের ধর্ম প্রচারের জন্য পৃথিবীর যেসব স্থানে গেছে, সেসব স্থানে তারা আমগাছ লাগিয়েছে। এভাবে আমের উত্পাদন পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়েছে।

সারা পৃথিবীতে আম ফলের রাজা হলেও আমের রাজা হচ্ছে ‘আলফানসো’। ভারতে মহারাষ্ট্রের রত্নগিরিতে আমটি উদ্ভাবন করেছেন একজন পুর্তগীজ উদ্ভিদত্ত্ববিদ। প্রসঙ্গক্রমে বিভিন্ন দেশে বিখ্যাত আমের নাম উলেস্নখ করতে হয়। এর মধ্যে আলফানসো হচ্ছে ভারতের বিখ্যাত আম। এরপর বাংলাদেশের ল্যাংড়া, পাকিসত্মানের চোষা, ফিলিপাইনের কারাবো, ইন্দোনেশিয়ার অরম্নমানিশ ও গোলেক, কম্বোডিয়ার কম্বোডিয়ানা এবং যুক্তরাষ্ট্রের হ্যাডেন হচ্ছে পৃথিবীর মধ্যে বিখ্যাত আম।

আমাদের দেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আমের নামগুলো বেশ আকর্ষনীয়, তেমনি আমের স্বাদও বিভিন্ন রকমের। বোধ করি স্বাদ ও বর্ণের উপর ভিত্তি কওে আমের বিভিন্ন নাম দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে ভারত উপমহাদেশে রাজা-বাদশাহেদর কাছে আকর্ষনীয় করে তোলার জন্য আমের নাম দেয়া হয়েছে রানী পসন্দ, রাজাভোগ, নবাব পসন্দ ও দুধসর। হিন্দুদের দেব-দেবীদের পূজা ও অর্ঘ্য ও ভোগ দেয়ার জন্য আমের নাম দেয়া হয়েছে লক্ষণ ভোগ, কালি ভোগ, সীতা ভোগ, গোপাল ভোগ। আমের বাহারি বর্ণকে কেন্দ্র করে আমের নাম দেয়া হয়েছে জাফরান, স্বর্ণরেখা, নীলাম্বয়ী, সুবর্ণরেখা। ভারতের আম ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের কাছে আমকে আকর্ষণীয় করার জন্য আলফানসো আমকে লাজুক মহিলা, দুসরি আমকে সুন্দরী গৃহকর্মী ও ল্যাংড়া আমকে মুকুটবিহীন রাজা বলে ডেকে থাকেন। এছাড়া আমাদের দেশ ও ভারতের বিভিন্ন মিষ্টির নামের সাথে আমের নামের মিল দেখা যায়। এসব আমের নাম হচ্ছে রাজভোগ, মোহনভোগ, মিশি্রকান্ত্ম ও মতিমান্ডা ইত্যাদি। আমের নাম ও জাত নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রঞ্জা ও মেধার পরিচয় দিয়েছেন উদ্ভিদতত্ত্ববিদ ও মালিরা।

ভারতে ২ হাজারের বেশি আমের জাত রয়েছে। এসব জাতের আমের নামগুলো বেশ আর্কষণীয়। আমের স্বাদ, বর্ণ, রূপ,  ঘ্রাণ ও রস কেন্দ্র করে অবশ্য আমের নানা দেয়া হয়েছে।

ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি যে, প্রাচীনকাল থেকেই অনেক ঐতিহাসিক পরিব্রাজক এই উপমহাদেশে এসেছেন। তারা আম দেখে ও খেয়ে মুগ্ধ হয়েছেন। এদের মধ্যে আছেন ইবনে বতুতা, হিউ-এন সাং ও ফাহিয়েন অন্যতম। মহাবীয় আলেকজান্ডার সিদ্ধু উপত্যকার সুদৃশ্য আমবাগান ও আম দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। আমবাগান সৃষ্টি ও আমের বিভিন্ন জাত তৈরির ক্ষেত্রে মোগলদের অবদান বেশি। তাঁরা পাঁচ শতাধিক নতুন আমের জাত তৈরি করেছিলেন। তাঁরা আমের বোঁটা মধু অথবা ঘি-এর মধ্যে ডুবিয়ে রাখতেন। এভাবে আম দীর্ঘদিন সতেজ থাকত।

সারা পৃথিবীতে আম শুধু খাওয়া ও দেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। আমাকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের শিল্পকর্ম গড়ে উঠেছে। এসব শিল্পকর্ম যুগ যুগ ধরে শৈস্নল্পিক ঐতিহ্য বহন করে আসছে। এর মধ্যে অজান্ত্মা ইলোরার গুহাচিত্রে আমপাতা ও আমের চিত্র উলেস্নযোগ্য। ১৫২৩ সালে রাজশাহীর বাঘায় সুলতান নসরত শাহ একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। এই মসজিদে মেহরাবের বাম পাশে টেরাকোটা মোটিকে আম ও আম পাতায় চিত্র লক্ষ্যনীয়। এছাড়া ভারতের অ্যামব্রয়ডারি, কাশ্মীরিশাল, কাঞ্চি পুরম, রাজশাহী সিল্ফ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ নকশী কাঁথায় আমের মোটিফ দেখা যায়। ভারত ও বাংলাদেশের তাঁত শিল্পে আম্বিকা মোটিফ যুগ যুগ ধরে ঐতিহ্য বহন করে আসছে। বাংলাদেশের পোষাকে আম্বিকা মোটিফকে কোলকা মোটিফ বলা হয়। মোগল আমলে পোশাক শিল্পে যে ‘ম্যাঙ্গো’ মোটিফ স্টাইল তৈরি হয়েছে, তা সারা পৃথিবীতে এখনো বিখ্যাত ও নন্দিত।

ভারত উপ মহাদেশের সাহিত্যকে সম্বৃদ্ধ করেছে আম। সংস্কৃত সাহিত্যের প্রাচীন কবি কালীদাসের কাব্যে আম প্রসঙ্গটি নানাভাবে ওঠে  এসেছে। পালি সাহিত্যে জাতকের গল্প ও ভারতীয় উর্দু সাহিত্যের কবি মির্জা গালিব তাঁর কবিতায় আমকে নানা উপমায় তুলে ধরেছেন।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যে আমকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নানা রূপে বিশেস্নষণ করেছেন, এমনটি অন্য কোন কবি সাহিত্যিকের রচনায় দেখা যায় না। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের কবিদের মধ্যে মাইকেল মধুমূদন দত্ত, জাতীয় কবি কাজী নজরম্নল ইসলাম, জসীম উদ্দীন, বেগম সুফিয়া কামাল, জীবনানন্দ দাস, সুকুমার রায়, বন্দে আলি মিয়া, সেলিম মোসত্মফা, আবিদ আজাদ, নির্মলেন্দু গুন,শাহাবুদ্দীন নাগরী, আমিমুল ইসালম ও মাসুদার রহমানসহ অনেক কবি ছড়াকারের রচনায় আম অন্যন্য ও অপরূপ হয়ে উঠেছে।

আম শুধু ভোগ বা খাওয়ার জন্য নয়, আমের মধ্যে রয়েছে ঔষুধিগুণসহ বহুবিধ উপকারী দিক। আম ক্যানসার প্রতিরোধক। এর মধ্যে রয়েছে এন্টিঅক্সিডেন্ট ও পর্যাপ্ত ক্যারোটিন। নানাগুনে সম্বৃদ্ধ আম। আম দিয়ে মদসহ ভোগ্য ও প্রসাধনী পন্য সারা পৃথিবীতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আম দিয়ে তৈরি ঔষুধ ভারত, বাংলাদেশ, বৃটেন, অস্ট্রেলিয়া ও আমেরিকায় বাজার পেয়েছে। এসব ঔষুধের গুনাগুন তুলনাবিহীন।

আমাদের দেশ ও ভারতে আম উত্সব পুরানো দিনের ঘটনা। যুগযুগ ধরে আম উত্সব গ্রাম বাংলার বাড়িতে বাড়িতে পালিত হয়ে থাকে। হিন্দু সমাজে জামাইষষ্টী এ উত্সবের একটি অংশ। আমাদের দেশ ও ভারতের মুসলিম সমাজে নতুন জামই বাড়িতে আম উপচেইকন দেয়া হয়। নানা বর্ন ও নানা স্বাদের আম ধামা না সাজিতে রঙ্গীন কাপড় দিয়ে ডেকে জামাই বাড়িতে পাঠানো হয়। এর সাথে থাকে চালের আটাসহ নানা উপকরণ। এই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে শুরম্ন হয়েছে আম উত্সব।

আমাদের দেশে জাতীয়ভাবে আম উত্সব অনুষ্ঠিত না হলেও বিচ্ছিন্ন ভাবে ইদানিং সারা দেশে আম উত্সব অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ আম উত্সব অবশ্যই অভিনন্দন যোগ্য। কারণ এই আম উত্সবে দুর্লভজাতসহ বিভিন্ন জাতের আমের পরিচয় করিয়ে দেয়া যায়। আম উত্সবকে কেন্দ্র করে ইদানিং আমপ্রেমীদের মধ্যে কৌতূহল আরো বাড়ছে। ইতিমধ্যে আমাদের কয়েকটি জাতীয় পত্রিকা ও  এ ছাড়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও আম উত্সবের আয়োজন করেছে।

আমাদের দেশে পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ বরণ করা হয়, পান্ত্মা ভাত ও ইলিশ দিয়ে। সংড়্গিপ্তভাবে একে পান্ত্মা ইলিশ বলা হয়। এই ধারাবাহিকতা বেশি দিনের ঘটনা নয়। তাই আসুন, আমরা আগামীতে আম উত্সব পালন করি আম, দুধ ও ভাত একত্রিত করে। আম, দুধ ও ভাত একত্রিত করে খাওয়া বাঙালীর ঐহিত্যের খাবার। এখনো বাঙালী সমাজে জামাইদের আম দুধের দাওয়াত দেয়া হয়। আমরা এ ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আগামীতে আম উত্সব এই বিষয়টি যেন সংযোজন করি।