x 
Empty Product

আরও একটি নতুন জাতের আমের প্রবেশ ঘটলো বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম-সাম্রাজ্যে। সহস্রাধিক জাতের ভিড়ে এই নতুন সংযোজন নিঃসন্দেহে একটি বড় ধরনের সাফল্য। যদিও কৃষি গবেষকদের মধ্যে তা এখনও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় রয়েছে। নতুন জাতের আমের নাম কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ রেখেছে “গৌড়মতি’। ‘সাধারণত বিগত কয়েক যুগে আম সাম্রাজ্যে যে কটি নতুন জাত এসেছে তা কৃষি গবেষণার মাধ্যমে। কিন্তু কিছুটা ভিন্নতা নিয়ে আমের এই নতুন জাতটি এসেছে প্রাকৃতিকভাবে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ আমের নতুন জাতটি পর্যবেক্ষণে রেখেছে। এমনটি বললেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ আম গবেষণাগারের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শফিকুল ইসলাম।
 চাঁপাইনবাবগঞ্জের কল্যাণপুর হর্টিকালচার সেন্টারে গত ১৭ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে এই নতুন জাতের আমটি অবমুক্ত করা হয়। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের মহাপরিচালক কৃষিবিদ মুকুল চন্দ্র রায় “নতুন জার্ম প্লাজম সংগ্রহ ও সম্প্রসারণ” শীর্ষক এক কর্মশালায় এই নতুন জাতের আমের অবমুক্তি ঘটানোর ঘোষণা দেন অনুষ্ঠানে আম চাষীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভাগের পদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ এবং মিডিয়া কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
 গত আম মৌসুমে হঠাৎ করে একটি আম গাছের সন্ধান মেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার সেন্টারে। নজরে আসার কারণ মৌসুমের একেবারে শেষ পর্যায়ে যখন কোন ধরনের আম বাজারে থাকার কথা নয়Ñ অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে বা ভাদ্রের মধ্যভাগে। গাছটির অবস্থান শিবগঞ্জ সীমান্তের শিয়ালমারি এলাকায়। সংশ্লিষ্ট বিভাগ অজানা ও অপ্রচলিত ফল খুঁজে বের করার ব্যাপারে সদা সতর্ক থাকায় ছুটে যায় গাছটির খোঁজে। এ ছাড়া মৌসুমের শেষের দিকে আমের দেখা মেলায় আগ্রহটা আরও বেড়ে যায়। গাছের নিচে গিয়ে কর্মকর্তারা দেখেন থোকা থোকা আম ঝুলছে। দেখতে অনেকটা ল্যাংড়ার মতো। পাশাপাশি নাবি জাতের আম এত সুস্বাদু হয়! বিস্ময়ের সৃষ্টি করে হর্টিকালচার কর্মীদের। এর রং আকৃতি, স্বাদ ও গন্ধের গুণাবলী বলে দেয় এই নাবি জাতের সৃষ্টি হতে পারে প্রাকৃতিকভাবে ল্যাংড়ার সঙ্গে আশ্বিনার শংকরায়নের মাধ্যমে। এই ধরনের ধারণা নিয়ে হর্টিকালচার কর্তৃপক্ষ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ চালাতে থাকে।
 উল্লেখ্য, এই আম গাছটির মালিক এরফানের জানা ছিল না যে, তার গাছের আম নিয়ে এত সাড়া পড়বে। প্রতিবারের মতোই এরফান বাগান বিক্রির সঙ্গে সঙ্গে গাছটি চলে যায় ফলক্রেতা জাহাঙ্গীরের হাতে। যুবক জাহাঙ্গীর আলম মৌসুমের শেষ পর্যায়ে গাছে প্রচুর আম দেখে গাছটির যথাযথ পরিচর্যা শুরু করেন। গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর তিনি প্রায় সাত মণ আম গাছ থেকে পেড়ে পাঠিয়ে দেন চট্টগ্রামে। স্বাদ, গন্ধ ও মিষ্টতায় শীর্ষে থাকা আমগুলো লুফে নেয় চট্টগ্রামের মানুষ। ১২ হাজার টাকা মণ ও ৩শ’ টাকা কেজিতে বিক্রি করে দারুণ উৎসাহিত হয়ে পড়েন জাহাঙ্গীর। সেই বছর জাহাঙ্গীর পুরো গাছ থেকে আম পেয়েছেন প্রায় ৪০ মণ। এই ধরনের মাঝারি গোছের ১৭/১৮ বছরের গাছ থেকে এত বেশি পরিমাণ আম পাওয়ার ব্যাপারেও রেকর্ড সৃষ্টি হয়। সব ধরনের খবরা খবর রেখে হর্টিকালচার কর্তৃপক্ষ অপেক্ষা করতে থাকে চলতি মৌসুমের জন্য। জাতটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং সর্বশেষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে নাবি আম উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে বলেন এই মৌসুমে গাছটির পুরো দায়িত্ব গ্রহণ করে হর্টিকালচার কর্তৃপক্ষ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ব¡বিদ ড. সাইফুর রহমান জানান, এই অপ্রচলিত সুস্বাদু আমের জাতটির নতুন নামকরণ ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে চারা উৎপাদনের কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়েছে। জাতটির নামকরণ ও অবমুক্ত অনুষ্ঠানে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের মহাপরিচালক কৃষিবিদ মুকুল চন্দ্র রায় তার আওতায় থাকা ৭২টি হর্টিকালচার সেন্টারকে ৮ হাজার চারা উৎপাদনের নির্দেশ দেন। এই চারা আঁটি ও ডগা কেটে এক বছরের মধ্যে তৈরি করে সামনের মৌসুমে বিতরণের জন্য কৃষকদের মধ্যে। পুরো গাছের আম ১২ হাজার টাকা মণ দরে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ এবার কিনে নিয়েছে।
 প্রাকৃতিকভাবে উদ্ভাবিত গৌড়মতি আমের আকৃতি আকর্ষণীয় গোলাকার। গড় ওজন ৫০০ গ্রাম। পাকা আমের রং হলুদ। মুকুল আসার সময় ফাগুন মাস (ফেব্রুয়ারি-মার্চ)। ফল সংগ্রহের সময় আগস্ট-সেপ্টেম্বর। ফলের শাঁস হলুদ, রসালো, আঁশবিহীন মিষ্টি এবং ভক্ষণযোগ্য অংশ শতকরা ৮০ ভাগ। আঁটি ছোট পাতলা। সংরক্ষণ সন্তোষজনক। মধ্যম আকৃতির গাছ থোকায় থোকায় ফল ধারণ করতে পারে। তবে এই আম রক্ষণাবেক্ষণে প্রচুর সময় ও অর্থ ব্যয়ের যোগ রয়েছে।
 কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের চাঁপাইনবাবগঞ্জ আম গবেষণা কেন্দ্র প্রধান ড. সফিক জানান ইতোমধ্যে সংগ্রহ করা আম তাদের প্রধান গবেষণাগারে পাঠানো হয়েছে। একাধিক বিশেষজ্ঞ নিয়ে গঠিত টিম প্রচুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করায় কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের অবমুক্ত করা আম ‘গৌড়মতি’র সম্প্রসারণ ও গ্রহণযোগ্য অনুমতি এবং অবমুক্তির স্বীকৃতি দিতে পারে বলে অভিমত দিয়েছেন।

04 Sep 2013

গৌড়মতি

Published in ব্লগ

সোনামসজিদ এলাকার বালিয়াদিঘী বাজার থেকে দুই কিলোমিটার পূর্বদিকে একটি আমবাগান। আর এ বাগানের একটি আমগাছের আম নিয়ে কৃষি বিভাগের হর্টিকালচার বিভাগ তালগোল পাকিয়েছে। সমপ্রতি ওই আম গাছের নিচেই একটি কর্মশালার আয়োজন করে চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার দপ্তর। কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন কৃষি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মুকুল চন্দ্র রায়। আরও উপস্থিত ছিলেন কৃষি বিভাগের আম গবেষণা কেন্দ্র ও কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের সমন্বিত মানসম্পন্ন উদ্যান উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক এসএম কামরুজ্জামানসহ ডজনখানেক কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাদের বক্তব্য থেকে স্পষ্টই প্রমাণ হয় ওই আমের জাতটি আম গবেষণা কেন্দ্র বা হর্টিকালচারের কোন উদ্ভাবন নয়। আনুমানিক ২০ বছর আগে ওই বাগানের মালিক এরফান আলী একটি ল্যাংড়া আমের আঁটি ওই বাগানে পুঁতে আমগাছ করেন। সেই সঙ্গে এ বাগানে ওই গাছটির চারপাশেই রয়েছে আশ্বিনা (নাবিজাত) আমের গাছ। হর্টিকালচার বিভাগের তথ্য অনুসারে, ল্যাংড়া ও আশ্বিনা এই দুই জাতের আমের মুকুলের প্রাকৃতিক পরাগায়নের মাধ্যমে এ নতুন জাতের আমের সৃষ্টি হয়েছে। আমগাছটির আকৃতি পুরোটা অন্যান্য ল্যাংড়া আমগাছের মতোই। পাতার রং ল্যাংড়া আমের মতো। ওই এলাকার আম চাষিদের কাছ থেকে যে তথ্য পাওয়া যায় তা থেকে স্পষ্টই যে, ওই আমগাছটি ল্যাংড়া আমের আঁটি থেকেই উৎপত্তি হয়েছে। এ ধরনের আমগাছ প্রায় বিভিন্ন বাগানেই দেখা যায়। আম চাষিরা জানান, এ এলাকায় কয়েক জাতের আম রয়েছে। যেগুলো মূলত এসেছে ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে। ভারতের চৌষা আম বাংলাদেশে এসে হয়েছে চোরসা। যেমন ভারতের লক্ষণভোগ আম বাংলাদেশে এসে নাম হয়েছে লক্ষণা ও বোগলাগুটি। এ ধরনের অনেক আমই ভারত থেকে বাংলাদেশে আমদানি হয়ে আসার পর অনেক চাষিরাই ওই আমের আঁটি থেকে গাছ তৈরি করে ভিন্ন জাতের নাম দিয়ে থাকে। আম চাষিরা জানান, মাটির গুণগত কারণে একই বাগানে বিভিন্ন রকম আমের বিভিন্ন ধরনের স্বাদ হয়ে থাকে। এ আমটির আকার সম্পূর্ণ ল্যাংড়া আমের মতো, তবে সাইজ বা ওজন অন্যান্য ল্যাংড়ার থেকে বড় ও গোলাকার। আমের বোটার নিচের সম্মুখভাগে কিছুটা হালকা সিঁদুরে রং রয়েছে। ফলে এ আমের নামকরণ করা হয়েছে ‘গৌড়মতি’। হর্টিকালচার বিভাগ এ আমের নাম ‘গৌড়মতি ’ রাখলেন কেন জিজ্ঞাসা করা হলে কোন সঠিক জবাব পাওয়া যায়নি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে। কৃষি বিভাগের একটি সূত্র থেকে জানা যায়, গত বছর আষাঢ়-শ্রাবণ মাসের দিকে কৃষি অধিদপ্তরের সঙ্গনিরোধ কীটতত্ত্ববিদ বিভাগের একজন উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা সোনামসজিদে তাদের অফিস পরিদর্শনে এসে বাজার থেকে এ আম কিনে নিয়ে যান ঢাকায়। খাওয়ার পরই আমটি সুস্বাদু বলে প্রচার করে কৃষি বিভাগের মধ্যে এবং এ গাছের আদ্যপ্রান্ত সংগ্রহ করার নির্দেশ দেয়া হয় হর্টিকালচার বিভাগকে। ওই নির্দেশের পর কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের সমন্বিত মানসম্পন্ন উদ্যান উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক এসএম কামরুজ্জামান ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচারের প্রধান কর্তাব্যক্তি ওই আমের জাতকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে প্রচার করার জন্য তৎপর হয়ে ওঠে। ২০১২ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশ হয় ‘অসময়ে ল্যাংড়া আম ৩শ’ টাকা কেজি’। এ সংবাদ প্রকাশের পর হর্টিকালচার বিভাগ আরও উৎসাহী হয়। কিন্তু প্রকৃত তথ্য না নিয়ে ওই আমকে নিয়ে তোড়জোড় সৃষ্টি করেন হর্টিকালচার বিভাগ। অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ আম গবেষণা কেন্দ্রের একজন কর্মকর্তা জানান, আমের কোন জাতকে বাজারজাত করতে হলে নিয়ম মাফিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গঠিত কমিটির মাধ্যমে তা প্রকাশ করে বাজারজাত করার নিয়ম। কিন্তু নিয়মনীতিকে তোয়াক্কা না করে হর্টিকালচার বিভাগ ওই আমের জাতকে বাজারজাত করার চেষ্টা করেছেন। অপরদিকে এলাকাবাসী জানান, ঐতিহাসিক গৌড়ের সোনামসজিদ মূলত নাবিজাত আম আশ্বিনা প্রধান এলাকা। জাতে আশ্বিনা হলেও অন্যান্য এলাকার আমের মতোই কিছুটা টকমিষ্টি এবং এতে সুগারের পরিমাণ কম। আশ্বিনা আম মূলত আগে আশ্বিন মাসে পাকত বলে তার আম হয়েছিল আশ্বিনা। কিন্তু বর্তমানে অগ্রহায়ণ মাসেও আশ্বিনা আম পাওয়া যায়। কিন্তু হর্টিকালচার বিভাগ এ লেট ভ্যারাইটির আমটিকে নিয়ে কোন গবেষণা না করেই ভুল তথ্য দিয়ে যাচ্ছে।

আম গাছটির বয়স এখন প্রায় ১৫ বছর। গত ৩ বছর আগে বাগান মালিকের কাছ থেকে এখানে একটি আম বাগানের আম ক্রয় করি। প্রথম বছর আগাম আম বিক্রি করলেও গত বছর থেকে দেরীতে বিক্রি করছি। দামও ভাল পাচ্ছি। গত বছর থেকে প্রতিমন ১২ হাজার টাকা থেকে সাড়ে ১২ হাজার টাকা দরে বিক্রি করছি। এবার ইতোমধ্যে ৬০ হাজার টাকায় এ গাছের আম বিক্রি করেছি।
 শনিবার গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে কথাগুলো বলেলেন শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের বালিয়াদিঘি গ্রামের আম চাষী জাহাঙ্গীর আলম। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার শিয়ালমারা গ্রামের বালিয়াদিঘী আম বাগানে নাম না জানা দেশীয় ল্যাংড়া আমের মত স্বাদের একটি আম গাছের সন্ধান গত বছর পাওয়া যায়। তখন এ আমকে অসময়ের ল্যাংড়া বলা হয়েছিল। বাংলার পুরাতন রাজধানী গৌড়ের সাথে মিল রেখে স্থানীয়ভাবে এ বছর এ আমের নামকরণ করা হয়েছে ‘গৌড়মতি’।
 শনিবার এ আম দেখার জন্য ঢাকা থেকে ছুটে আসেন বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ কয়েকটি বিভাগের কৃষি বিষয়ক বিভিন্ন সেক্টরের উর্দ্ধতন কর্মকর্তাগণ। তারা বাগানে এসে নিজ চোখে এ আম পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং অনেকেই এ আমের স্বাদ গ্রহণ করেছেন। কথা বলেছেন আম চাষীদের সঙ্গে। এ উপলক্ষ্যে আম বাগানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার সেন্টারের সমন্বিত মানসম্পন্ন উদ্যান উন্নয়ন প্রকল্পর ব্যবস্থাপনায় এক কর্মশালার আয়োজন করা হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজশাহী অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক একরাম হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন মহাপরিচালক কৃষিবিদ মুকুল চন্দ্র রায়। অন্যদের মাধ্যে বক্তব্য রাখেন খাদ্য শস্য উৎপাদন বিভাগের পরিচালক কৃষিবিদ অনিল চন্দ্র রায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. শফিকুল ইসলাম, সমন্বিত মানসম্পন্ন উদ্যান উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক এসএম কামরুজ্জামান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদ ড. সাইফুর রহমান, কৃষিবিদ কার্তিক চন্দ্র চক্রবর্তী, আম চাষী জাহাঙ্গীর আলম। উপস্থিত অতিথি ও গণমাধ্যম কর্মীরা নাবী জাতের এ আম খেয়ে জানান, স্বাদ হুবহু ল্যাংড়া আমের মতই।
 প্রধান অতিথির বক্তব্যে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মুকুল চন্দ্র রায় বলেন, দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে উন্নতমানের এই জাতের আমের বাগান সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। তবে প্রাথমিক ভাবে স্বল্প পরিসরে সম্প্রসারণ করা হবে। পরীক্ষা নিরীক্ষার পর সুফল পাওয়া গেলে শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জই নয়-পর্যায়ক্রমে দেশের বিভিন্ন স্থানে এ আমের বাগান সম্প্ররণ করা হবে। আমটির নাম করণের ব্যাপারে তিনি বলেন, পরীক্ষা নিরীক্ষার আগে কোন স্থায়ী নামকরণ করা ঠিক হবেনা।
 উল্লেখ্য, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বাগান গুলোতে একই সময় আম গাছ মুকুলিত হলেও আম পাকে কয়েকটি পর্যায়ে। প্রথম দিকে পাকে প্রথম জাতের সুস্বাদু আমের মধ্যে গোপালভোগ, এর পর ক্ষিরসাপাত, তারপর পাকে ল্যাংড়া, এরপর মধ্যম জাতের আম ফজলি এবং সব শেষে পাকে নাবী জাতের আম আশ্বিানা। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বাজারে এখনও আশ্বিনা আম পাওয়া যাচ্ছে এবং পুরো আশ্বিন মাস জুড়েই পাওয়া যাবে বলে আম চাষীরা জানিয়েছেন। এ আম বিক্রি হচ্ছে প্রতিমন ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা দরে। এ ক্ষেত্রে নাবী জাতের নতুন গৌড়মতি আমটি পরীক্ষা নিরীক্ষা করে আম বাগান সম্প্রসারণ করে বাজারে আনা গেলে আম চাষীর পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও ইতবাচক ভূমিকা রাখবে এমনটা প্রত্যাশা সকলের।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের ঐতিহাসিক সোনামসজিদ এলাকার বালিয়াদিঘী বাজার থেকে দুই কিলোমিটার পূর্বদিকে বাগানের একটি আমগাছের আম নিয়ে কৃষি বিভাগের হর্টিকালচার বিভাগ বেশ তালগোল পাকিয়েছেন। গতকাল সকালে ঐ বাগানের মধ্যে আমগাছটির নিচেই একটি কর্মশালার আয়োজন করেন কৃষি বিভাগের চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার দপ্তর। এই কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন কৃষি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মুকুল চন্দ্র রায়। সেই সাথে উপস্থিত ছিলেন কৃষি বিভাগের আম গবেষণা কেন্দ্র ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সমন্বিত মানসম্পন্ন উদ্যান উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক এসএম কামরুজ্জামান সহ ডজন খানেক কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাদের বক্তব্য থেকে স্পষ্টই প্রমাণ হয় ঐ আমের জাতটি আম গবেষণা কেন্দ্র বা হর্টিকালচারের কোন উদ্ভাবন নয়। আনুমানিক ২০ বছর আগে ঐ বাগানের মালিক এরফান আলী একটি ল্যাংড়া আমের আঁটি ঐ বাগানে পুতে আমগাছ তৈরী করেন। সেই সঙ্গে ঐ বাগানে ঐ গাছটির চারপাশেই রয়েছে আশ্বিনা (নাবিজাত) আমের গাছ। হর্টিকালচার বিভাগের তথ্য অনুসারে ল্যাংড়া ও আশ্বিনা এই দুই জাতের আমের মুকুলের প্রাকৃতিক পরাগায়নের মাধ্যমে এ নতুন জাতের আমের সৃষ্টি হয়েছে। আমগাছটির আকৃতি পুরোটায় অন্যান্য ল্যাংড়া আমগাছের মতই। পাতার রং ল্যাংড়া আমের মত। ঐ এলাকার আমচাষীদের কাছ থেকে যে তথ্য পাওয়া যায় তা থেকে স্পষ্টই যে ঐ আমগাছটি ল্যাংড়া আমের আঁটি থেকেই উৎপত্তি হয়েছে। এ ধরনের আম গাছ প্রায় বিভিন্ন বাগানেই দেখা যায়। আম চাষীরা জানান, এ এলাকায় কয়েক জাতের আম রয়েছে যেগুলো মূলত এসেছে ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে। ভারতের চৌষা আম বাংলাদেশে এসে হয়েছে চোরসা। যেমন ভারতের লক্ষণভোগ আম বাংলাদেশে এসে নাম হয়েছে লক্ষণা ও বোগলাগুটি। এধরনের অনেক আমই ভারত থেকে বাংলাদেশে আমদানী হয়ে আসার পর অনেক চাষীরাই ঐ আমের আঁটি থেকে গাছ তৈরী করে ভিন্ন জাতের নাম দিয়ে থাকে। আমচাষীরা জানায়, মাটির গুণগত কারণে একই বাগানে বিভিন্ন রকম আমের বিভিন্ন ধরনের স্বাদ হয়ে থাকে। এ আমটির আকার সম্পূর্ণ ল্যাংড়া আমের মত তবে সাইজ বা ওজন অন্যান্য ল্যাংড়ার থেকে বড় ও গোলাকার। আমের বোটার নিচের সম্মুখ ভাগে কিছুটা হালকা সিঁদুরে রং রয়েছে। এই আমের নামকরণ করা হয়েছে “গৌড়মতি ”। হর্টিকালচার বিভাগ এ আমের নাম “গৌড়মতি ” রাখলেন কেন জিজ্ঞাসা করা হলে কোন সঠিক জবাব পাওয়া যায়নি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে। কৃষি বিভাগের একটি সূত্র থেকে জানা যায়, গত বছর আষাঢ়-শ্রাবণ মাসের দিকে কৃষি অধিদপ্তরের সংগনিরোধ কীটতত্ববিদ বিভাগের একজন উ”চ পর্যায়ের কর্মকর্তা সোনামসজিদে তাদের অফিস পরিদর্শনে এসে বাজার থেকে এ আম কিনে নিয়ে যায় ঢাকা। খাওয়ার পরই আমটি সুস্বাদু বলে প্রচার করে কৃষি বিভাগের মধ্যে এবং এ গাছের আদ্যপ্রান্ত সংগ্রহ করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয় হর্টিকালচার বিভাগকে। ঐ নির্দেশের পর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সমন্বিত মানসম্পন্ন উদ্যান উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক এসএম কামরুজ্জামান ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচারের প্রধান কর্তাব্যক্তি ঐ আমের জাতকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে প্রচার করার জন্য তৎপর হয়ে উঠে। মূলত গত ১৮/০৯/২০১২ তারিখে ঢাকার একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশ হয় “অসময়ে ল্যাংড়া আম ৩শ’ টাকা কেজি ” এই শিরোনামে সংবাদ প্রকাশের পর হর্টিকালচার বিভাগ আরো উৎসাহিত হন। কিš‘ প্রকৃত তথ্য না নিয়ে ঐ আমকে নিয়ে তোড়জোর সৃষ্টি করেন হর্টিকালচার বিভাগ। অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ আম গবেষণা কেন্দ্রের একজন কর্মকর্তা জানান, আমের কোন জাতকে বাজারজাত করতে হলে নিয়ম মাফিক পরীক্ষা নিরীক্ষা করে গঠিত কমিটির মাধ্যমে তা প্রকাশ করে বাজারজাত করার নিয়ম। কিš‘ নিয়মনীতিকে তোয়াক্কা না করে হর্টিকালচার বিভাগ ঐ আমের জাতকে বাজারজাত করার চেষ্টা করেছেন। অপরদিকে এলাকাবাসী জানান, ঐতিহাসিক গৌড়ের সোনামসজিদ মূলত নাবিজাত আম আশ্বিনা প্রধান এলাকা। জাতে আশ্বিনা হলেও অন্যান্য এলাকার আমের মতই কিন্তু কিছুটা টকমিষ্টি এবং এতে সুগারের পরিমাণ কম। যার কারণে এলাকার মানুষ অতি আগ্রহে এ আম খেয়ে থাকেন। আশ্বিনা আম মূলত আগে আশ্বিন মাসে পাকত বলে তার আম হয়েছিল আশ্বিনা। কিš‘ বর্তমানে অগ্রহায়ন মাসেও আশ্বিনা আম পাওয়া যায় ঐ এলাকায়। কিš‘ হর্টিকালচার বিভাগ এ লেট ভ্যারাইটির আমটিকে নিয়ে কোন গবেষণা করেনি আদৌ।

  •  Start 
  •  Prev 
  •  1 
  •  2 
  •  Next 
  •  End