x 
Empty Product

 আম আমাদের দেশের সর্বাধিক জনপ্রিয় ফল। এর সাথে অন্য কোন ফলের তুলনা হয় না। কারণ উৎকৃষ্ট জাতের আম স্বাদে, পুষ্টিতে, সুবাসে, তৃপ্তিতে এবং দেখতে খুবই আকর্ষণীয়। আম এমন একটি ফল যা কাঁচা পাকা সর্বাবস্থায় খাওয়া যায়। ঝরে পড়া ছোট আম আমাদের বাচ্চাদের কাছে যে কত প্রিয় তা ছোটরাই ভালো জানে। ফলটি দেশে বিদেশে সবার কাছে সমানভাবে সমাদৃত। আম পছন্দ করে না এমন লোক হয়ত খুঁজে পাওয়া যায় না। তাই অনেকে আমকে ফলের রাজা বলে থাকেন।

আমের বর্তমান অবস্থাঃ
আমাদের প্রায় ৫০,০০০ হেক্টর জমিতে আমের গাছ বা বাগান রয়েছে। বর্তমানে মোট আম উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ১,১০,০০০ টন। মাথাপিছু আম উৎপাদনের পারিমাণ দেড় কেজির মতো। যা অনেক দেশের তুলনায় আমাদের মাথাপিছু আমের উৎপাদন খুবই কম। প্রতিবেশি ভারতে মাথাপিছু উৎপাদন ১২ কেজি, পকিস্তানে ৭ কেজি এবং ফিলিপাইনে ১৩ কেজি। ষাটের দশকে এদেশে মাথাপিছু আমের উৎপাদন ছিল ৫ কেজির মতো। পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা বলে থাকেন, একজন সুস্থ সবল স্বাভাবিক লোকের জন্য প্রতিদিন ৮৫ গ্রাম ফল খাওয়া প্রয়োজন অথচ এদেশে আমরা গড়ে ৪০ গ্রাম ফল খেয়ে থাকি যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। সুতরাং আমাদের পুষ্টিমান বজায় রাখার জন্য অন্যান্য ফলের সাথে আমের উৎপাদন বাড়াতে হবে।

আম চাষের মুনফাঃ
দানাশস্য যেমন ধান,গম ইত্যাদি চাষাবাদের চেয়ে আম চাষে ৫/৭ গুন বেশি লাভ। দানাশস্যে উৎপাদন খরচ অত্যন্ত বেশি। সে সাথে শ্রমিক সংকট সার, বালাইনাশক পেতে সমস্যার সৃষ্টি হয়। আমের উৎপাদন খরচ একেবারেই কম  অপরদিকে নিট মুনাফার পরিমাণ অনেক বেশি। অনেক এলাকার আম বাগান মালিকগণ ৩/৪ বছরের জন্য আম বাগান বিক্রয় করে থাকেন, এসব ক্ষেত্রে মালিকের কোনো বিনিযোগ করতে হয় না এবং কোনো ঝামেলায় পড়তে হয় না। আমের রোগাক্রান্ত ও ছাঁটাইকৃত ডালপালা এবং ঝরে পড়া পাতা সংগ্রহ করে জ্বালানির কাজে ব্যবহার করা যায়। উঁচু জমিতে আম বাগান স্থাপন করলে ৮/১০ বছর পর্যন্ত আম বাগানে ধান/ গম/ শাকসবজির চাষ করা সম্ভব। তাই আম বাগান স্থাপনের প্রথমদিকেও ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। উপরন্তু বাগান স্থাপনের পঞ্চম বছর থেকেই আম গাছ থেকে মুনাফা আসা শুরু হয়। একটি আম বাগান স্থাপন করলে দু‘ভাবে মুনাফা পাওয়া যায়। এক, আম ফল ও ছাঁটাইকৃত ডালপালা বিক্রয় থেকে প্রতি বছর আয়। দুই, ফলন শেষে আম গাছ বিক্রয় থেকে আয়। সুতরাং আম চাষ করলে লাভের পরিমাণ যে অনেক বেশি একথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

খাদ্য হিসেবে আমঃ
আম এমন একটি ফল যা কচি অবস্থা থেকে খাওয়া যায়। কাঁচা, পাকা উভয় আমই সরাসরি খাওয়া যায়। উপরন্তু আম দিয়ে নানা রকম মুখরোচক ও উৎপাদেয় খাদ্য তৈরি করা সম্ভব। কাঁচা আম থেকে বহুবিধ খারার যেমন আচার, আমচুনা, চাটনি, মোরব্বা আবার পাকা আম দিয়ে জুস, জেলি, স্কোয়াশ, সিরাপ, টফি আমসত্ব ইত্যাদি খাদ্য তৈরি করা যায়। মুড়ি, খৈ ইত্যাদির সাথে পাকা আম খেতে বেশ সুস্বাদু। বেশি পরিমাণ আম খেলে হজমে অসুবিধা হয় না। কাঁচা আম দিয়ে তৈরি টক তরকারি ভাতের সাথে খেতে খুবই মজাদার। আম ছাড়া অন্য কোনো ফল থেকে এত প্রকার খাবার তৈরি করা সম্ভব নয়। আমের আঁটির ভিতরের শাঁসও গ্রাম এলাকায় অনেকে খেয়ে থাকেন। আম পাতা বা আমের খোসা গরু ছাগলের প্রিয় খাদ্য।

আমের ওষুধি গুণঃ
আম একটি ফল হলেও এর অনেক ওষুধি গুন রয়েছে। আয়ুবেদীয় ও ইউনানী পদ্ধতির চিকিৎসায় পাকা আমকে হজমকারক এবং বলকারক খাদ্যরূপে অভিহিত করা হয়। কাঁচা ও পাকা উভয় প্রকার আমে ভিটামিন‘এ’ থাকায় চোখের জন্য বেশ উপকারি। আম খেলে যকৃত ভালো থাকে। আম পাতা পোড়ানো ধোঁয়া হিক্কা রোগ ও গলার প্রদাহকে উপশম করে। আমের কচি পাতা চিবিয়ে দাঁত মাজলে দাঁত ও মাড়ি শক্ত হয়। আম পাতা গোড়া ছাই আগুনে পোড়া ক্ষতে প্রয়োগ করলে তা তাড়াতাড়ি শুকিয়ে যায়। আম গাছের বাকলের রস বা কচি পাতার রস সাধারণ আমাশায় বা রক্ত আমশয়ে বেশ উপকারি। আম বীজের শাঁসের ক্লথ আদা সহকারে সেবন করলে উদরাময়ে উপকার পাওয়া যায়।

আম চাষের সম্ভবনাঃ
আমাদের দেশে মাথাপ্রতি চাষাযোগ্য জমির পরিমাণ খুবই কম। নতুন নতুন ঘর বাড়ি ও রাস্তা ঘাট তৈরি, কলকারখানা স্থাপন এবং নদী ভাংগনে অনেক চাষযোগ্য জমি প্রতি বছর কমে যাচ্ছে। তাই ফসলী জমিতে আম বাগান স্থাপনের সুযোগ কমে যাচ্ছে। চট্রগ্রাম, পার্বত্য চট্রগ্রাম, সিলেটের পাহাড়ের ঢালে আম বাগান স্থাপনের এাখনও সুযোগ রয়েছে। রাজশাহী বিভাগের বরেন্দ্র অঞ্চলে সেচের সুবদ্যবস্থা না থাকায় চাষাবাদে বিঘœ ঘটে। সেখানকার আম বাগান সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।

শহরাঞ্চলে বাড়ির আশেপাশে আম গাছ লাগানোর মত খোলা জায়গা নেই। তবে বাড়ির ছাদে ২/৪টি আম গাছ লাগানো তেমন কোনো কঠিন কাজ নয়।এতে পরিবারের আমের চাহিদার অনেকটাই পূরণ করা সম্ভব। ড্রাম, সিমেন্টের তৈরি টব বা ইটের তৈরি বড় টব বানিয়ে গাছ লাগানো সম্ভব। যে সমস্ত জাতের বৃদ্ধি কম যেমন বারি আম-৩, বারমাসি, লতা বোম্বাই ইত্যাদির চাষ করা যায়। আম গাছ লাগানোর ইচ্ছা থাকা সত্বেও ভালো চারার অভাবে অনেকে আম গাছ লাগাতে পারে না। তাই দেশের বিভিন্ন এলাকায় উন্নত জাতের আমের চারা সরবরাহের ব্যবস্থা নিতে হবে।

আমাদের দেশের উল্লেখযোগ্য আম গাছ আঁটি থেকে উৎপন্ন। এদের ফলনও অত্যন্ত কম। উপরন্তু আম চাষে আমাদের অনভিজ্ঞতা ও অবহেলার কারণে হেক্টরপ্রতি ফলন তুলনামূলকভাবে অনেক কম। আঁটির গাছগুলোকে টপওয়াকিং-এর মাধ্যমে উন্নতজাতে পরিবর্তনের ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশে ভালো জাতের আমের উৎপাদন বাড়াতে হবে। জনগণকে এ ব্যাপারে সচেতন করে তুলতে হবে। উন্নত পদ্ধতিতে আম চাষে সরকার ও জনগণ উভয়কে এগিয়ে আসতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা এবং সুচিন্তিত কর্মপদ্ধতি নিয়ে অগ্রসর হতে পারলে অবশ্যই দেশে আম উৎপাদন বাড়বে এবং অতিরিক্ত আম বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে।

আমের গবেষণাঃ
আমাদের দেশে আমের উৎপাদন ক্রমান্বয়ে কমতে থাকায় সরকার ১৯৮৫ সনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় আম গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করেন। আম একটি দীর্ঘ মেয়াদি ফসল হওয়ায় গবেষণার ফলাফল পেতে দীর্ঘ সমায়ের প্রয়োজন পড়ে। আম গবেষাণা কেন্দ্রে বিভিন্ন রকম সমস্যা থাকলেও বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টায় এ পর্যন্ত চারটি আমের জাত (বারি আম-১, বারি আম-২, বারিআম-৩ এবং বারি আম-৪) মুক্তায়ন করা সম্ভব রয়েছে। জাতগুলোর প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এগুলো সুমিস্ট এবং প্রতি বছর নিয়মিত ফল দেয়। এদের মধ্যে দু‘টি জাত পাকার সময় উজ্জ্বল হলুদ রঙ ধারণ করে। এ ছাড়াও এ কেন্দ্র থেকে রোগ ও পোকা দমন, জাত উন্নযন, সার ও সেচ প্রদান ইত্যাদি বিষয়ের ওপর অনেক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে। প্রশিক্ষণ ও সম্প্রসারণ কাজের ফলে বৃহত্তর রাজশাহী জেলার আম চাষি ভাইয়েরা এখন অনেক- বেশি সজাগ। দেশের অন্যান্য এলাকার আম চাষি ভাইয়েরা আম চাষে যত্নশীল হলে শুধুমাত্র সাধারণ পরিচর্যা গ্রহণের মাধ্যমে আমের উৎপাদন সন্তোষজনক পর্যায়ে উন্নীত করা সম্ভব। আম গবেষণা থেকে পরিপূর্ণ ফলাফল পেতে হলে গবেষণা কেন্দ্রটির উন্নয়ন তথা আরো বিজ্ঞানী নিয়োগ, গবেষণাগার উন্নয়ন, বিজ্ঞানীদের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি ও আরো বাজেট বরাদ্দ করা প্রয়োজন।

আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিভিন্ন জাতের আম বাজারে কেনাবেচা শুরু হওয়ায় জমে উঠেছে আমের বাজার। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতার শঙ্কায় হাজার কোটি টাকার আম ব্যবসা নিয়ে ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে ব্যবসায়ীরা। এবার বৈরী আবহাওয়া এবং আমের অনইয়ার হওয়ায় জেলায় প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হবে বলে কৃষি বিভাগ জানান।

জেলার বৃহত্তম আমবাজার কানসাট, শিবগঞ্জ বাজার, রহনপুর, মলি্লকপুর, ভোলাহাট ও জেলা শহরের সদরঘাট এখন ভোর হতে গভীর রাত পর্যন্ত আমচাষি ও ব্যাপারীদের ভিড়ে মুখরিত। বাগান থেকে আম পাড়া, টুকরি তৈরি ও ট্রাক বোঝাই থেকে শুরু করে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে মেতে উঠেছে বাজারের লক্ষাধিক আমচাষি ও ব্যবসায়ী। সুস্বাদু আম কেনার জন্য ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, চৌমুহনী, সিলেট, খুলনাসহ বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীরা ইতিমধ্যে জেলার আমপ্রধান এলাকায় আসা শুরু করেছে। লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও হাজার কোটি টাকার লেনদেনে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে জেলার গ্রামীণ অর্থনীতি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সমপ্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আবুল কালাম জানান, শুরুতে অনাবৃষ্টি আর টানা খরায় বিপাকে পড়েছিল আমচাষিরা। কিন্তু সময়মত বৃষ্টি হওয়ায় আম ব্যবসায়ীরা আমের ফলন নিয়ে বেজায় খুশি। জেলার ৫টি উপজেলায় ২৩ হাজার ৮শ হেক্টর জমিতে প্রায় ১৭ লাখ ৮৫ হাজার আমগাছ রয়েছে। তবে আম ব্যবসায়ীরা জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে টানা খরা আর অনাবৃষ্টিতে ক্ষতির মুখে পড়লেও এখন পর্যন্ত বড় ধরনের ঝড়ের মুখে পড়েনি আমবাগানগুলো।

জানা গেছে, এবার দেরিতে আম পাকায় বাজারে এখন পাওয়া যাচ্ছে গোপালভোগ, খিরসাপাত, খুদি খিরসা, বৃন্দাবনি, কুয়াপাহাড়ী, মধুচুষকি, মিশরিকান্ত, লাল সিদুরি, সাটিয়ারক্যাড়া, হিমসাগরসহ আগাম জাতের গুটিআম। গোপালভোগ ১৪০০-১৬০০, খিরসাপাত ১৫০০-১৬০০, গুটিআম ৮০০-৯০০ টাকা দরে বেচাকেনা হচ্ছে। দাম বেশি হওয়ায় এবার আম ব্যবসায়ীরা খুশি। সদরঘাটের আম ব্যবসায়ী হারুন জানান, জুনের প্রথমেই সরকারি কর্মচারীদের বেতন এবং বিভিন্ন জাতের আম ব্যাপকহারে বাজারে আসায় আমের বাজার জমজমাট হয়ে উঠেছে।

কানসাটের আম ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম জানান, এবারে জেলায় বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় আমের আকার তুলনামূলকভাবে ছোট। প্রতিবছর আম গাছে মুকুল ও গুটি আসা পর্যন্ত আমবাগানগুলো কয়েকদফা বেচাকেনা হলেও এবার দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে হাজার কোটি টাকার আমবাগান বেচাকেনা নিয়ে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে আম ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে শিবগঞ্জে সামপ্রতিক সময়ে সহিংসতায় ৮ জন নিহত, একাধিক সংঘর্ষ, গুপ্ত হামলাসহ অস্থিরতা বিরাজ করায় জেলার সবচেয়ে বড় আমের বাজার কানসাটে আম নিয়ে আসা চাষিরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এর প্রভাব ইতিমধ্যে কানসাট আমবাজারে লক্ষ্য করা গেছে।

জেলার অর্থনীতি চাঙ্গা রাখার স্বার্থে আম মৌসুমে রাজনীতিক কর্মসূচি মুক্ত জেলা হিসেবে এখন থেকেই সোচ্চার হয়েছে আম ব্যবসায়ীরা। কানসাটের আম ব্যবসায়ীরা ইতিমধ্যে আম ব্যবসার ভবিষ্যত নিয়ে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সাথে বৈঠকে বসার চিন্তা-ভাবনা করছে।

কানসাটের মকবুল হোসেন জানান, এবার বাজারে আমের ব্যাপক আমদানি থাকলেও রাজনীতি কর্মসূচিতে ট্রাক ভাংচুর ও অগি্নসংযোগের ঝুঁকির কারণে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আম নিয়ে যেতে আম ব্যবসায়ীদের দ্বিগুণ ভাড়া গুনতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে বাজারে আমের দাম বেড়েই থাকছে।