x 
Empty Product
Thursday, 22 June 2017 09:47

আমে চাঙ্গা অর্থনীতি

Written by 
Rate this item
(0 votes)

রাজশাহী অঞ্চলে আমেই ঘুরছে অর্থনীতির চাকা। জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেই উঠতে শুরু করেছে আম। এখন আমের ভরা মৌসুম। বাজারে ক্ষীরশাপাতি বা হিমসাগর, ল্যাংড়া, রানীপছন্দ ও ফজলি আমের ছড়াছড়ি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে প্রতিদিন শত শত ট্রাক আম কিনে নিয়ে যাচ্ছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা। কৃষি বিভাগ বলছে, এ মৌসুমে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের চাষিরা প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার আম বিক্রি করবেন। এতে চাষিদের ঘরে যেমন আসছে সচ্ছলতা, তেমনি মৌসুমজুড়ে মিলেছে হাজারো মানুষের কাজের সুযোগ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কৃষি বিভাগ এবার রাজশাহী জেলার প্রায় ১৬ হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় দুই লাখ টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। যদিও কয়েকটি বড় ঝড়ে অনেক ক্ষতি হয়েছে। তবুও কৃষি বিভাগ বলছে, আম পর্যাপ্ত এসেছিল গাছে। তাই ঝড়ে ঝরে পড়লেও আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে। বিভিন্ন আমের গড় মূল্য কেজিতে ৩৫ টাকা ধরা হলে দুই লাখ টন আমের মূল্য আসবে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা।

আম উৎপাদনে বিখ্যাত আরেক জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ। সেখানে এবার ২৬ হাজার হেক্টর জমিতে আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল প্রায় আড়াই লাখ টন। ঝড়ে ক্ষতি হওয়ার পরও কৃষি বিভাগের দাবি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে। সেই হিসাবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের চাষিরা এবার প্রায় সাড়ে আটশ' কোটি টাকার আম বিক্রি করবেন।

এ বছর জ্যৈষ্ঠের মাঝামাঝি থেকেই বাজারে উঠতে থাকে মধু ফল আম। শুরু থেকেই এবার আমের বাজার ভালো যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা। শুরুতেই বিভিন্ন গুটি আম ও গোপালভোগ বাজার দখলে নেয়। এবার ভালোমানের গুটি আমও ৯০০ থেকে দেড় হাজার টাকা মণ বিক্রি হয়েছে। এ ছাড়া ভরা মৌসুমে গোপালভোগ, ক্ষীরশাপাতি বা হিমসাগর এবং ল্যাংড়া আম মণ ১৬শ' থেকে ২২শ' টাকা পর্যন্ত পাইকারি বিক্রি হচ্ছে। চাষিরা বলছেন, এই মূূল্য বেশ ভালো। লক্ষণভোগ

বা লকনা আম বিক্রি হচ্ছে ১১শ' থেকে ১২শ' টাকা মণ। এখন ফজলি আম প্রতি মণ ১২শ' থেকে দেড় হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে পুরোদমে এখনও ফজলি নামতে শুরু করেনি। ল্যাংড়া আমের মৌসুম শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ফজলি বাজারে আসবে। শেষ পর্যন্ত ফজলির দাম ভালো থাকলে চাষিরা ঝড়ের ক্ষতি কিছুটা হলেও পুষিয়ে নিতে পারবেন বলে আশা করছেন।

রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আলীম উদ্দিন জানান, ঝড়ে অনেক আম ঝরেছে বলে মনে হলেও এই পরিমাণ ঝরার কথাই ছিল। কারণ গাছে যত আম এসেছিল তা কোনোভাবেই ধারণযোগ্য ছিল না। তিনি জানান, প্রতি বছরই নতুন নতুন বাগান হচ্ছে। গাছে ফল আসছে। তাই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়েছে। চাষিরাও বেশ যত্নবান হওয়ায় এখন আর আমের অফইয়ার বা অনইয়ার বলে কিছু থাকছে না।

এই আম ঘিরে এখন হাজার হাজার মানুষের মৌসুমি কর্মসংস্থান হয়েছে। এক সময় যাদের কোনো কাজ ছিল না, তারা এখন কেউ বাগান পাহারা দিচ্ছেন, কেউ বাগানের পরিচর্যার কাজ করছেন। কেউ ভ্যান-ট্রলি চালিয়ে আম পরিবহনের কাজ করছেন। কেউ আড়ত খুলে বসেছেন, কেউ প্যাকেটিংয়ের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। কুরিয়ার সার্ভিসগুলোতে এখন উপচেপড়া ভিড়। প্রতিদিন হাজার হাজার কেজি আম কুরিয়ারে করে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এ ছাড়া আম বাজারজাত করতে ধানের খড়, চটের বস্তা ও ঝুড়ির কদর বেড়েছে কয়েকগুণ।

রাজশাহীর বৃহত্তম বানেশ্বরহাটে এবারও বসছে আমের পাইকারি হাট। সরেজমিন দেখা গেছে, বিভিন্ন এলাকার মানুষ রিকশাভ্যান, নসিমন-করিমন ও ভটভটিতে করে আম নিয়ে আসছে। হাটের ভেতরে আমভর্তি হয়ে যাওয়ার পর রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়কের দু'ধারে আমের ঝুড়ি বহনকারী শতশত ভ্যান ও ভটভটি অপেক্ষা করছে। তবে সন্ধ্যার মধ্যেই সব আম বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। রাতেই এসব আম ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে।

বানেশ্বর হাটের আম ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম জানান, এখাসে প্রতি মণ লকনা বা লক্ষণভোগ ১২শ', গোপালভোগ ১ হাজার ৮০০ থেকে দুই হাজার, ক্ষীরসাপাতি দুই হাজার, ল্যাংড়া ১ হাজার ৮০০, বিভিন্ন প্রজাতির গুটি বা আটি আম ৮০০ থেকে ১৫শ' টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তিনি জানান, এখান থেকে প্রতিদিন প্রায় ৩০ থেকে ৪০ ট্রাক আম ঢাকা, টাঙ্গাইল, চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা, কুমিল্লা, চাঁদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছে।

নওশাদ আলী নামে এক শ্রমিক জানান, বানেশ্বরে প্রায় ২০০ আমের আড়ত রয়েছে। এই আড়তগুলোর অধীনে কাজ করছে প্রায় চার হাজার মৌসুমি শ্রমিক। একজন শ্রমিক প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় করছেন।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক আবদুল আওয়াল জানান, গত বছর ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতিতে চাষ করা রাজশাহীর ৩০ টন আম বিদেশে রফতানি করা হয়েছে। এবার ১০০ টন রফতানির লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। তবে দেশের ভেতরেও কীটনাশকমুক্ত ব্যাগিং পদ্ধতিতে চাষ করা আমের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তাই ব্যাগিং পদ্ধতিতে উৎপাদিত আম চাষিরা বেশি দামে বিক্রি করে অতিরিক্ত আয় করছেন।

চাষিরা জানান, গত বছর ব্যাগিং করে আম প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি হয়েছে। তাই এবার অনেক চাষি ব্যাগিং করেছেন। গত বছর ৭ হাজার আম ব্যাগিং করেছিলেন বাঘা উপজেলার মনিগ্রামের চাষি জিল্লুুর রহমান। লাভ দ্বিগুণ হওয়ায় এবার তিনি এক লাখ আম ব্যাগিং করেছেন। জিল্লুর রহমান বলেন, সাধারণভাবে চাষ করা আশ্বিনা আম বাজারে ৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছিল। তখন ব্যাগিং করে চাষ করা আশ্বিনা আম ঢাকার বাজারে বিক্রি হয়েছে প্রতিকেজি ৯৫ টাকায়। ৫০ টাকা দরের ফজলি আম ব্যাগিং করে ঢাকার বাজারে বিক্রি হয়েছিল ১২০ টাকা কেজি দরে।

Read 1747 times

Leave a comment

Make sure you enter the (*) required information where indicated. HTML code is not allowed.