x 
Empty Product
Wednesday, 04 September 2013 07:49

আমের দেশে

Written by 
Rate this item
(1 Vote)

ত্তরবঙ্গের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় এ দেশে সবচেয়ে বেশি আম চাষ হয়। জায়গাটি তাই আমের রাজধানী হিসেবেই খ্যাতি লাভ করেছে। আমের বাগান ছাড়াও এখানে আছে দেখার মতো অনেক প্রাচীন স্থাপনা। চাঁপাই গেলে ঘুরে আসতে পারেন সেসব জায়গা থেকে।

থানাঘাট আমবাজার

চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের পশ্চিম পাশ দিয়ে বয়ে চলা সুন্দর নদীটিই মহানন্দা। আমের মৌসুমে শহরের থানাঘাটে প্রতিদিন সকাল বেলা দূরদূরান্ত থেকে আম বোঝাই অনেক নৌকা ভিড় জমায়। খুব ভোরে শুরু হয়ে এ বাজার বেলা বাড়ার কিছু পরেই শেষ হয়ে যায়। এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহরের ভেতরেই আছে বেশ কয়েকটি বড় বড় আম বাগান। এগুলোও ঘুরে দেখা যায়।
মহানন্দা নদী

 
 শহর ছেড়ে শিবগঞ্জ যেতে মহানন্দা নদীর উপরে সেতু পার হতে হয়। এ সেতুতে দাঁড়িয়ে উপভোগ করতে পারেন মহানন্দার সৌন্দর্য। শীতকালের চেয়ে বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানি ভরপুর থাকে। পার ঘেঁষে ধানখেত, নদীতে সারি সারি নৌকা-- হঠাৎ দেখলে মনে হবে যেন শিল্পীর অাঁকা ছবি।

শিবগঞ্জের আমবাগান

চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর ফেলে মহানন্দা সেতু পেরিয়ে সোনা মসজিদ স্থল বন্দরের সড়ক ধরে চললে দুপাশে চোখে পড়বে শুধুই আমবাগান। এ জায়গার বেশিরভাগ আমবাগানই বেশ পুরনো। আমের মৌসুমে সব বাগানেই মালিকদের উপস্থিতি থাকে। অনুমতি নিয়ে যে কোনো বাগানই ঘুরে দেখা যায়। সব গাছেই ডালভর্তি আম। হাত দিয়ে ছুঁতে পারলেও গাছ থেকে আম পাড়া খুবই অন্যায়। তাই এ বিষয়ে সাবধান থাকতে হবে।
 কানসাট আমবাজার

চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে রয়েছে এ দেশের সবচেয়ে বড় আমের বাজার কানসাট। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এ বাজারে চলে আমের বিকিকিনি। আম চাষিরা অনেক দূর থেকে সাইকেল বা রিকশাভ্যানে করে আম নিয়ে সকাল থেকেই এখানে জড়ো হতে থাকেন। আমের মৌসুমে এ হাট সপ্তাহের প্রতিদিনই বসে।

 
ভোলাহাট আমবাজার

এ অঞ্চলের আরেকটি বড় আমের বাজার ভোলাহাট। ভারত সীমানার কাছে বাজারটিতেও প্রচুর আমের সমাগম ঘটে।
ছোটসোনা মসজিদ

 কানসাট বাজার থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে স্থলবন্দর সড়কের পূর্ব পাশে অবস্থিত সুলতানি স্থাপত্যের রত্ন হিসেবে খ্যাত ছোটসোনা মসজিদ। কালোপাথরে নির্মিত এ মসজিদটির স্থাপত্যশৈলী খুবই সুন্দর। ঢুকতেই চোখে পড়বে একটি শিলালিপি। যেটা থেকে জানা যায় জনৈক মজলিস মনসুর ওয়ালী মোহাম্মদ বিন আলীর তত্ত্বাবধানে এই মসজিদটি তৈরি হয়। তারিখ মুছে যাওয়ায় মসজিদ নির্মাণের সঠিক সময় জানা যায়নি। তবে এতে সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহর নাম থাকায় ধারণা করা হয় মসজিদটি তাঁর রাজত্বকালের (১৪৯৪-১৫১৯) কোনো একসময় নির্মিত।

এই স্থাপনার পূর্বপাশে একটি পাথরের মঞ্চের উপরে দুটি সমাধি রয়েছে। এখানে কারা সমাহিত হয়েছেন, তা সঠিক জানা যায়নি। মসজিদ প্রাঙ্গণের অভ্যন্তরে দক্ষিণ-পূর্ব কোণে দুটি আধুনিক সমাধি রয়েছে। যার একটিতে সমাহিত আছেন বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর।
তাহ্‌খানা

 সোনা মসজিদের পশ্চিম পাশে বিশাল একটি দিঘি। এর পার ঘেঁষে আছে পাশাপাশি তিনটি প্রাচীন স্থাপনা। সবচেয়ে দক্ষিণেরটি হল তাহখানা। ভবনটিতে ছিল বেশ কয়েকটি কক্ষ। এর লাগোয়া পূর্বদিকের দিঘির ভেতর থেকেই ভিত্তি গড়ে তুলে ভবনটির পূর্বাংশ তৈরি করা হয়েছিল। নির্মাণকাল সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য জানা যায় না গেলেও জনশ্রুতি আছে সম্রাট শাহজাহানের ছেলে শাহ সুজা ১৬৫৫ সালে ভবনটি নির্মাণ করেছিলেন। আবার কারও মতে শাহ সুজা গৌড় অঞ্চলে বসবাসকারী তার পীর শাহ নিয়ামত উল্লাহর জন্য এ ভবন নির্মাণ করেন।

শাহ নিয়ামত উল্লাহ মসজিদ

তাহখানা লাগোয়া উত্তরপাশে রয়েছে তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ। পূর্বদিকে একটি খোলা আঙিনার চারপাশে আছে অনুচ্চ দেয়াল। যেটার মাঝামাঝি জায়গায় আছে তোরণসহ প্রবেশপথ। মসজিদটির পূর্ব দেয়ালের দিকে তিনটি এবং উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে একটি করে প্রবেশপথ আছে। প্রচলিত আছে যে, সম্রাট শাহজাহান বছরে পাঁচ হাজার টাকা আয়ের একটি সম্পত্তি দান করেন শাহ নিয়ামত উল্লাহকে। যেটার আয় থেকে তার খানকায় খরচ চালাতেন। আর বাকি অর্থ দিয়ে এ মসজিদ নির্মাণ করেন।
শাহ নিয়ামত উল্লাহর সমাধি

মসজিদের লাগোয়া উত্তর দিকের ভবনটি শাহ নিয়ামত উল্লাহর সমাধি। যেটি প্রায় তিন বিঘা জায়গাজুড়ে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। দক্ষিণ দেয়ালে আছে প্রবেশপথ। এখান থেকে পাকাপথ ধরে কিছুটা সামনেই সমাধি সৌধ। যার চারপাশে রয়েছে পাথরে বাঁধানো বেশ কিছু কবর। দিল্লির করনৌল প্রদেশের অধিবাসী শাহ নিয়ামত উল্লাহ ছিলেন একজন সাধক পুরুষ। কথিত আছে ভ্রমণের প্রতি তার ছিল প্রবল ঝোঁক। একসময় তিনি এসে উপস্থিত হন এই এলাকায়। শাহ সুজা তখন বাংলার সুবেদার। নিয়ামত উল্লাহর সাক্ষাতে মুগ্ধ হন শাহ সুজা। এরপর এ জায়গায় বসবাস শুরু করেন। ১৬৬৪ সালে এখানেই তিনি মারা যান। তবে তার কবরের উপরে সৌধটি কে নির্মাণ করেন সে সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য জানা যায় না।
দারাসবাড়ি মাদ্রাসা

 তাহখানা থেকে সামনে সোনা মসজিদ স্থল বন্দরের আগে রাস্তার পশ্চিম পাশে চোখে পড়বে একটি প্রাচীন মাদ্রাসার ধ্বংসাবশেষ। প্রায় ৫৫ মিটার দৈর্ঘ্যের বর্গাকৃতির এ স্থাপনাতে চল্লিশটি কক্ষ ছিল। এখানে একটি ঢিবির কাছে চাষ করার সময় কৃষকরা ইটের তৈরি প্রাচীর ও একটি শিলালিপির সন্ধান পান। সেটি থেকে জানা যায়, মাদ্রাসাটি সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহ ১৫০৬ সালে নির্মাণ করেছিলেন। দরস অর্থ শিক্ষা আর দরসবাড়ি অর্থ শিক্ষাকেন্দ্র। দরসবাড়িই কালক্রমে দারাসবাড়ি নামে রূপান্তরিত হয়েছে।
দারাসবাড়ি মসজিদের ধ্বংসাবশেষ

দারাসবাড়ি মাদ্রাসা থেকে সামান্য পশ্চিমে বড় একটি পুকুরের উপরে অবস্থিত দারাসবাড়ি মসজিদ। কলকাতার জাদুঘরে সংরক্ষিত এ মসজিদের শিলালিপি থেকে জানা যায়, ১৪৭৯ খ্রিস্টাব্দে শামসুদ্দীন আবুল মুজাফফর ইউসুফ শাহ এটি তৈরি করেন। মসজিদটির ছাদ বহু আগেই ভেঙে পড়েছে। আর সামনে টিকে আছে বারান্দার ধ্বংসাবশেষ। বাংলার মধ্যযুগীয় স্থাপত্যকলায় এ মসজিদের ভেতরে-বাইরে লাল ইট আর পাথরের টেরাকোটা নকশা করা। মসজিদের দুটি অংশ। একটি সামনের বারান্দা এবং পশ্চিমে মূল প্রার্থনা কক্ষ। ভেতরে দাঁড়িয়ে আছে পাথরের স্তম্ভগুলো। কারুকাজ করা মসজিদের পশ্চিম দেয়ালের মিহরাবগুলো এখনও টিকে আছে কালের সাক্ষী হয়ে।
কোতোয়ালি দরওয়াজা

ভারত-বাংলাদেশের সীমান্তে ছোটসোনা মসজিদ স্থল বন্দর থেকে ভারতের প্রবেশপথটিই কোতোয়াল দরজা। নগর পুলিশের ফার্সি প্রতিশব্দ কোতওয়াল-এর অনুকরণে এর নামকরণ। সেই সময় নগর পুলিশ প্রাচীন গৌড়নগরীর দক্ষিণ অংশ রক্ষার কাজে নিয়োজিত ছিল বলে জানা যায়। ঢোকার পথে পূর্ব ও পশ্চিম পাশের দেয়ালে ছিদ্র আছে। এগুলো দিয়ে শত্রুর উপরে গুলি বা তীর ছোড়া হত বলে ধারণা করা হয়। বর্তমানে এটি প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। কোতোয়ালি দরওয়াজাটি সাধারণভাবে কাছে গিয়ে দেখার উপায় নেই। সোনা মসজিদ স্থলবন্দরে দাঁড়িয়ে কেবল দূর থেকে দেখা সম্ভব। কারণ এটি ভারতের অংশে পড়েছে।
খনিয়াদিঘি মসজিদ

 সোনা মসজিদ স্থলবন্দর থেকে পূর্বদিকে, প্রায় ১ কিলোমিটার দূরে রাস্তার বামপাশে পড়বে একটি আমবাগান। এর ভেতরেই খনিয়াদিঘির পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত মসজিদটি। ইটের তৈরি এক গম্বুজবিশিষ্ট এই স্থাপনাটি তখন টেরাকোটায় আচ্ছাদিত ছিল। যার অনেকগুলো এখনও আছে।


 

খনিয়াদিঘি মসজিদের নির্মাণকাল সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ঐতিহাসিকরা এটিকে ইলিয়াস শাহী আমলে ১৪৮০ সালের দিকে নির্মিত বলে মনে করেন। মসজিদের পূর্বদিকেই রয়েছে প্রাচীন আমলের খনিয়াদিঘি। মসজিদের অন্য একটি নাম হল রাজবিবি মসজিদ।
ধুনিচক মসজিদ

 খনিয়াদিঘি মসজিদের প্রায় ১ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি মসজিদ। এর উত্তর ও দক্ষিণের দেয়াল আর ভেতরে পাথরের স্তম্ভ এখনও টিকে আছে। ইটের তৈরি আয়তকার মসজিদটির নির্মাণকাল সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য নেই। তবে নির্মাণশৈলী বিবেচনায় এ মসজিদটিও ১৫ শতকের শেষের দিকে ইলিয়াস শাহী আমলে নির্মিত বলে ধারণা করা হয়।  
যাবেন যেভাবে

রাজধানী থেকে সরাসরি সড়কপথে চাঁপাইনবাবগঞ্জ যাওয়া যায়। ঢাকার গাবতলী ও কল্যাণপুর থেকে এ পথের বাসগুলো ছাড়ে। যেগুলোর মধ্যে আছে-- দেশ ট্রাভেলস, মডার্ন এন্টারপ্রাইজ, ন্যাশনাল ট্রাভেলস, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, লতা পরিবহন, দূরদূরান্ত পরিবহন ইত্যাদি।

সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলাচল করে এ পথের বাসগুলো। ভাড়া ৪০০-৪৫০ টাকা। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে কানসাট এবং সোনা মসজিদ স্থল বন্দরে যাওয়ার জন্য লোকাল ও বিরতিহীন বাস সার্ভিস আছে। ভাড়া ৪০-৫০ টাকা।
যেথায় থাকবেন

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শহরে থাকার জন্য সাধারণ মানের কিছু হোটেল আছে। শহরের শান্তি মোড়ে হোটেল আল নাহিদ, আরামবাগে হোটেল স্বপ্নপুরী, হোটেল রাজ ও হোটেল রংধনু। এসব হোটেলে ৪০০-১৫০০ টাকায় থাকা যায়।

Read 2037 times

Leave a comment

Make sure you enter the (*) required information where indicated. HTML code is not allowed.