x 
Empty Product
Wednesday, 27 January 2021 17:27

বারোমাসি আম বাগান

Written by 
Rate this item
(0 votes)

অনেকদিন ধরেই বাসায় আটকে আছি করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে। বাইরে তেমন একটা যাওয়া হচ্ছিল না। এর আগে বেসরকারি পর্যটন সংস্থা ‘কাছে এসো’র উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন জেলা ট্যুরের যে কার্যক্রম চালিয়ে আসছিলাম তাতে ছেদ পড়ে। সর্বশেষ আমরা গত বছরের ৫ মার্চ সুন্দরবন ট্যুর করি। এরপর থেকেই মূলত ঘরে বসা। তাই কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও আমরা পার্বত্য খাগড়াছড়ি জেলার রামগড় এবং ফেনী জেলা ট্যুরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। ফেনী সফরের উদ্দেশ্য ছিল অবসরপ্রাপ্ত মেজর সোলেমানের নিজ হাতে গড়ে তোলা দেশের অন্যতম বৃহৎ এবং বিখ্যাত সমন্বিত কৃষি খামার, বিশেষ করে বারোমাসি আম বাগান দেখা। ক’দিন আগে ‘চ্যানেল আই’-এ দেশের বরেণ্য কৃষিব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজের উপস্থাপনায় এ আম বাগান সম্পর্কে জানতে পারি। সে থেকেই ইচ্ছে ছিল সুযোগ পেলেই মেজর সাহেবের আম বাগান দেখতে যাব। অবশেষে গত ১৫ জানুয়ারি আমরা (মো. জহিরুল হক ভূঁইয়া, কেজি মোস্তফা, হেলাল উদ্দিন এবং আমি) ফেনী জেলার মুহুরী প্রজেক্টের উদ্দেশে যাত্রা করি। আগেই ট্রেনের টিকিট কেনা ছিল। আমরা সকালবেলা চট্টগ্রামগামী মহানগর প্রভাতীতে যাত্রা শুরু করি। আমরা তিনজন নির্ধারিত সময়ের বেশ কিছুক্ষণ আগেই কমলাপুর স্টেশনে উপস্থিত হই। টেন সিডিউল মতোই সকাল পৌনে ৮টায় যাত্রা শুরু করে। টেনে ওঠার পর আমরা বেশ রিল্যাক্স অবস্থায় চারদিকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে থাকি। ট্রেন বেশ ভালোভাবেই চলছিল। ট্রেনে আমরা গল্প করতে করতে কফি খেলাম। এক সময় আমরা ফেনী স্টেশনে উপস্থিত হই। তখন বেলা ১টা বেজে গেছে। আমরা জুমার নামাজ আদায় করি স্টেশনসংলগ্ন স্থানীয় একটি মসজিদে। নামাজ শেষে একটি হোটেলে দুপুরের খাবার গ্রহণ করি। আগেই মেজর মোহাম্মদ সোলায়মান (অব.) সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল। তিনি জানিয়েছিলেন, শুক্রবার বিশেষ কাজে নোয়াখালী যাবেন। কাজেই তিনি প্রকল্প এলাকায় উপস্থিত থাকতে পারবেন না। তবে তিনি প্রকল্পের দায়িত্বরত অন্যদের নির্দেশ দিয়ে যাবেন, যেন বাগান দেখতে আমাদের কোনো অসুবিধা না হয়। কিন্তু আমরা চেয়েছিলাম তিনি থাকা অবস্থায় আমরা আম বাগান দেখব। তাই পরিকল্পনা পরিবর্তন করে আমরা রামগড় চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।

 

রামগড় বাজারে গিয়ে যখন উপস্থিত হই, তখন প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আমরা স্টেশনে অবতরণ করে জানতে পারি এলাকায় কোনো ভালো হোটেল নেই। যে ক’টি হোটেল ছিল তাও করোনার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। কারণ করোনার কারণে এলাকায় এখন আর কোনো পর্যটক আসে না। আমরা একটি অটোরিকশা নিয়ে রামগড় হর্টিকালচার সেন্টারে গিয়ে উপস্থিত হই। হর্টিকালচার সেন্টারটি উঁচু পাহাড়ের ওপরে অবস্থিত। আমরা বেশ কষ্ট করে পাহাড়ের ওপরে চলে যাই। সেখানে হর্টিকালচার সেন্টারের একজন কর্মচারীর কাছে আমাদের থাকার বিষয়টি জানালে তিনি সেন্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপরিচালক মিজানুর রহমান মজুমদারের কাছে নিয়ে যান। আমরা ঢাকা থেকে এসেছি এবং আসার আগে কোথায় রাত্রীযাপন করব তা ঠিক করে আসিনি, জানতে পেরে তিনি হর্টিকালচার সেন্টারের বাংলোতে থাকার অনুমতি দিলেন। তার আচার-আচরণ ছিল খুবই সুন্দর এবং আন্তরিকতাপূর্ণ। আমরা সেখানে রাত্রীযাপন করি। আমরা যেখানে রাত্রীযাপন করি তার আশপাশে প্রচুর জঙ্গল এবং গাছ-গাছালিতে পূর্ণ। বাংলোর বারান্দায় দাঁড়ালে চারদিকে অনেক দূর পর্যন্ত দৃষ্টি চলে যায়। ক্রমেই রাত গভীর হতে থাকে। আমরা অনেক রাত পর্যন্ত জেগেই ছিলাম। মাঝেমধ্যে রাতজাগা পাখির ডাক শুনতে বেশ ভালোই লাগছিল। নিকষ কালো অন্ধকার এবং নিস্তব্ধ নৈঃশব্দ্যের যে আলাদা চমৎকার একটি রূপ আছে তা এখানে না এলে কেউ অনুভব করতে পারবেন না। সম্ভবত এটাই কবিতা লেখা এবং পড়ার উপযুক্ত স্থান। এমন নির্জন স্থানে মনে বিভিন্ন চিন্তার উদ্ভব হয়। আমাদের একজন বলছিলেন, এলাকাটি অনেকটা খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার ভূপ্রকৃতির সঙ্গে মিল আছে। এখানকার রাস্তাগুলোও খাগড়াছড়ির মতোই। তাকে বুঝিয়ে বলা হলো, রামগড় খাগড়াছড়ি জেলারই একটি থানা। কাজেই এর সঙ্গে মূল খাগড়াছড়ি জেলার ভূপ্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে মিল থাকাটাই স্বাভাবিক। রাতে বেশ ভালোই ঘুম হলো। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, পাহাড়ি অঞ্চল হলেও এখানে আমরা একটা মশার দেখাও পেলাম না। ফলে রাত্রীযাপনে কোনো অসুবিধাই হলো না। রাতের শেষ প্রহরে অজানা পাখির ডাকে ঘুম ভেঙে গেল। ধীরে ধীরে পূর্ব আকাশে আলোর রেখা ফুটিয়ে সূর্য উদয় হলো। আমরা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। সকালবেলা পাহাড়ি এলাকার অপরূপ সৌন্দর্য দর্শনে মুগ্ধ না হয়ে পারা গেল না। এখানে বাংলোয় দায়িত্বরত কর্মচারী সুজন চাকমার আন্তরিক ব্যবহারের মুগ্ধ না হয়ে পারা গেল না। সকালবেলা সুজন চাকমা বাজার থেকে আমাদের জন্য নাস্তা নিয়ে এলো। আমরা সবাই মিলে সেই নাস্তা গ্রহণ করি। এরপর হর্টিকালচার সেন্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপরিচালক মিজানুর রহমান মজুমদারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা একটি অটোরিকশায় রামগড় বাজারে চলে আসি। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয় তা হলো, আমরা রামগড় রাস্তার দু’পাশে বেশ কিছু চায়ের বাগান দেখতে পেলাম। বাগানগুলো বেশ সজীব এবং তরতাজা মনে হলো। রামগড়ে ভালো এবং উন্নত মানের চা উৎপাদিত হয় তা আগেই শুনেছিলাম। কিন্তু স্বচক্ষে দেখা হয়নি কখনোই। চা বাগান দেখতে পাওয়া আমাদের জন্য একটি চমৎকার অভিজ্ঞতা। মাঝেমধ্যে বেশ কিছু রাবার বাগানও দেখতে পেলাম। রাবার আহরণের জন্য ছোট ছোট পাত্র গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। রামগড় পরিদর্শনে গিয়ে আমার শুধুই মনে হচ্ছিল, বাংলাদেশ জনসংখ্যাধিক্য একটি ছোট দেশ; কিন্তু এর ভৌগোলিক বৈচিত্র্য কোনোভাবেই উপেক্ষা করার মতো নয়। রামগড় যাত্রার আগেই শুনেছিলাম, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নাকি একবার রামগড়ে এসেছিলেন। তিনি এখানে অবস্থানকালে বেশ কয়েকটি লেখা লিখেছিলেন। তবে এই তথ্যের কোনো সত্যতা আমরা আবিষ্কার করতে পারিনি। বেশ কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ হলেও তারা এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি। কাজেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রামগড় আসার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে এটা ঠিক যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যদি সত্যি এখানে এসে থাকেন, তাহলে তিনি নিশ্চিয় খুব খুশি হয়েছিলেন।

আমরা রামগড় বাজারে আসার পর ফেনীগামী একটি বাসে উঠে পড়ি। উদ্দেশ্য ফেনী শহরে যাওয়া। এক সময় আমরা ফেনী শহরের বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবতরণ করি। সেখান থেকে আমরা মোবাইল ফোনে মেজর সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার প্রকল্পের লোকেশন জেনে নিই। তারপর একটি অটোরিকশা রিজার্ভ করে মুহুরী প্রকল্পের দিকে যাত্রা শুরু করি। আমার জোহরের নামাজের ঠিক আগ মুহূর্তে মুহুরী প্রকল্প সংলগ্ন চর সাহাপুর এলাকার সোয়াস অ্যাগ্রো লিমিটেড প্রকল্পে উপস্থিত হই। মেজর সাহেব প্রকল্প অফিসেই ছিলেন। আমরা তার সঙ্গে পরিচিত হয় এবং প্রকল্প মসজিদে জোহরের নামাজ আদায় করি। নামাজ শেষে মেজর সাহেব আমাদের প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে নিয়ে যান। তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে বিভিন্ন প্রজাতির আমের গাছ এবং অন্যান্য ফলের গাছ আমাদের দেখালেন। তিনি জানালেন, তার পরিকল্পনা হচ্ছে বাংলাদেশের প্রত্যেকটি এলাকায় যেন বারোমাসি আমের চাষ হয়। যেন সবাই সারা বছর আম খেতে পারেন. সেই লক্ষ্যে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করা। মোহাম্মদ সোলায়মান তৃতীয় শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে তার বাবাকে হারান। স্থানীয় জমিদাররা তাদের জমিজমা নিয়ে যান। ১৯৬৮ সালে তিনি এসএসসি পাস করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। স্বাধীনতা অর্জনের পর তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। পর্যায়ক্রমে পদোন্নতি অর্জনের মাধ্যমে মেজর র‌্যাংকে উন্নতি হন। পরবর্তী সময়ে তিনি সেনাবাহিনীর চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন। এক পর্যায়ে তিনি কৃষি খামার গড়ে তোলার প্রতি মনোযোগী হন। তিনি গত ২৭ বছর ধরে কৃষি খামারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। মেজর সোলায়মান যে কৃষি খামার গড়ে তুলেছেন তা অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং অনন্য বৈশিষ্ট্যম-িত একটি সমন্বিত খামার। তিনি দেশের জনগণের জন্য ফলের জোগান দেওয়ার লক্ষ্যে এখনও নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন। বর্তমানে তার খামার এলাকার আওতায় ২২টি পুকুর রয়েছে। এগুলোতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ হচ্ছে। তার প্রকল্প এলাকায় ৪ হাজারেরও বেশি বিভিন্ন জাতের আম গাছ রয়েছে। বেশিরভাগ গাছেই এখন আম ধরে। আগামী কিছুদিনের মধ্যেই আরও ১ হাজার আম গাছ রোপণের পরিকল্পনা রয়েছে। তার বাগানে যেসব আম গাছ রয়েছে, তার বেশিরভাগই উন্নতজাতের। ভারত, থাইল্যান্ড থেকে বারোমাসি আমের চারা এনে তিনি এখানে রোপণ করেছেন। অনেকগুলো জাত বিদেশ থেকে আনা হয়েছে। তার বাগানের বারোমাসি আমগাছগুলো সবার মনেই বিস্ময়ের উদ্রেক করে। প্রকল্প এলাকায় ৩০০টি কাঁঠাল গাছ আছে। এছাড়া রয়েছে ৫০০টি সুপারি গাছ। ড্রাগন ফলের গাছ রয়েছে ৫০টির মতো। সোয়াস অ্যাগ্রো প্রকল্পে মোট ৩০ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ প্রকল্পে মধু উৎপাদিত হয়। এ প্রকল্পের মধু দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। সোয়াস অ্যাগ্রো লিমিটেড প্রকল্পে বছরের সব সময়ই আম পাওয়া যায়। প্রতি বছর গড়ে ২২ থেকে ২৫ টন আম উৎপাদিত হয়। মেজর মোহাম্মদ সোলায়মান (অব.) তার প্রকল্পে উৎপাদিত খাঁটি মধু দিয়ে ক্লিনহার্ট নামে এক ধরনের হারবাল ওষুধ তৈরি করেছেন। এটা নিয়মিত সেবন করলে হার্টের ব্লক থেকে অনেকটাই মুক্তি পাওয়া সম্ভব। সারা দেশে এ ওষুধ সরবরাহ করা হয়। মেজর সাহেব জানালেন, ক্লিনহার্ট সেবন করে অনেকেই উপকৃত হয়েছেন। ফলে এর চাহিদা দিন দিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আম বাগান দেখনোর সময় মেজর সোলায়মান বারবারই বলছিলেন, আমি যতদিন বেঁচে থাকব, এই বাগানের পরিচর্যা করে যাব। পরবর্তী সময়ে তার উত্তরাধিকারীরা এই বাগান দেখাশোনা করবে। তিনি চান সারা দেশে তার আম বাগানের মতো আম বাগান গড়ে উঠুক। যেন বাংলাদেশ আম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে। সৃষ্টিশীল এক ব্যক্তি একটি এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থা পরিবর্তনে অনন্য সাধারণ ভূমিকা রাখতে পারে মেজর মোহাম্মদ সোলায়মান (অব.) তার জ্বলন্ত উদাহরণ। আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা কর্মজীবন থেকে অবসর গ্রহণ করার পর নিজেদের অপাঙ্ক্তেয় মনে করেন। নিজেকে সমাজের বোঝা ভাবেন তাদের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মেজর মোহাম্মদ সোলায়মান (অব.)। আমরা চাই দেশের প্রত্যেকটি অঞ্চলে মেজর মোহাম্মদ সোলায়মান (অব.) এর মতো সৃষ্টিশীল মানুষের আবির্ভাব ঘটুক। বাংলাদেশ একটি আশ্চর্যজনক দেশ। এখানে জনসংখ্যাধিক্য থাকলেও সম্ভাবনার কোনো কমতি নেই। বাংলাদেশের ফল এবং মাছসহ অন্যান্য খাবার সবচেয়ে সুস্বাদু। এর কোনো তুলনা হয় না। শুধু উদ্যোগের অভাবে বাংলাদেশ এখনও তার সম্ভাবনার পুরোটা কাজে লাগাতে পারছে না।

Read 209 times

Leave a comment

Make sure you enter the (*) required information where indicated. HTML code is not allowed.