x 
Empty Product
Tuesday, 23 April 2019 06:47

আমের ফলন কমার আশঙ্কায় কীটনাশক ব্যবহার বাড়ছে

Written by 
Rate this item
(0 votes)



জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈরী আবহাওয়া ও পোকামাকড়ের আক্রমণে এ বছর আমের রাজ্য হিসেবে পরিচিত রাজশাহী অঞ্চলের আমবাগানগুলোতে ফলন কমে যাবার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় রোগবালাই থেকে আম রক্ষা করতে চাষিরা মরিয়া হয়ে আমগাছে কীটনাশক প্রয়োগ করতে শুরু করেছেন।

আমে বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার বন্ধে হাইকোর্টের একটি নির্দেশনার পর এ অঞ্চলের আমবাগানগুলোকে ইতিমধ্যেই প্রশাসনিক নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। তবে বাগানগুলোতে গিয়ে দেখা যায় যে, আম উৎপাদনকারীরা স্থানীয় প্রশাসনের চোখ এড়িয়ে আমগাছে রাসায়নিক প্রয়োগ অব্যাহত রেখেছেন।

আম চাষিরা বলছেন বর্তমান সময়ে যখন আম কেবল গুটি থেকে ধীরে ধীরে বড় হতে শুরু করেছে তখন ফল গবেষকদের পরামর্শ অনুযায়ী এই রাসায়নিক ব্যবহার মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর হবে না, কারণ আম বাজারে আসতে এখনো মাস-খানেকের বেশী সময় বাকী আছে।

ফল গবেষক ড. সরফ উদ্দিন বলেন, “এ বছর আম অনেক বৈরিতা সহ্য করছে। ফেব্রুয়ারির শেষে ও মার্চের প্রথমে মুকুল আসার সময় বৃষ্টিতে মুকুল ঝরে গেছে। এখন যখন আমগাছে ফল ফুটো করে দেওয়াসহ নানা রোগের প্রাদুর্ভাব হয়ে থাকে তখন তারা চাষিদের বিভিন্ন বৈধ কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তবে রোগ না হলে এটা ব্যবহারের প্রয়োজন নেই।”

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তারা বলছেন, হাইকোর্টের নির্দেশনার পর আম গাছে কোন রাসায়নিক প্রয়োগই আইনসিদ্ধ হবে না। কিন্তু বাগান পরিদর্শনে গিয়ে তারা আম চাষিদের অসহায়ত্ব দেখে কোন ব্যবস্থা নিতে পারছেন না।

“যদিও আমরা পরামর্শ দিয়েছি, কিন্তু হাইকোর্টের আদেশের পর সব রাসায়নিক প্রয়োগ নিষেধ করে দেওয়া হয়েছে,” বলছিলেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহী অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক দেব দুলাল ঢালী।

উল্লেখ্য, হাইকোর্ট গত ৯ এপ্রিল এক আদেশে রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার ও রাজশাহী রেঞ্জ পুলিশের ডিআইজিকে নির্দেশ দিয়েছেন যে তারা সাত দিনের মধ্যে আমে বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার ঠেকাতে রাজশাহী অঞ্চলের আম বাগানগুলোতে ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ মোতায়েন নিশ্চিত করবেন। গত ১৬ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টে হাইকোর্টের আদেশটি রদ করার একটি আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং ওই আদেশ বহাল রাখা হয়। এতে করে এ অঞ্চলের আম গাছে কোন বিষাক্ত রাসায়নিক আর ব্যবহার করা যাবে না।


রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার ও রেঞ্জ পুলিশের ডিআইজি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছেন যে ৯ এপ্রিলের হাইকোর্টের আদেশটি তারা এখনো হাতে পাননি। তবে টেলিভিশন ও খবরের কাগজের মাধ্যমে আদেশটি জেনে তারা একটি বিভাগীয় সমন্বয় সভা করেছেন যেখানে আমবাগানে বিষাক্ত রাসায়নিক প্রয়োগের ব্যাপারটি একটি আলোচনার বিষয় ছিল।

সভায় আম উৎপাদন হয় এমন সব জেলার, বিশেষ করে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এবং সংশ্লিষ্ট উপজেলাগুলোতে একাধিক ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যাদের নেতৃত্বে পুলিশ আমবাগানগুলো নজরদারি করবে।

বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আমবাগানগুলো কিভাবে নজরদারি করা হবে জানতে চাইলে রাজশাহীর ডিআইজি একেএম হাফিজ আক্তার বলেন, “দেশের সর্বোচ্চ আদালত যে আদেশ দিয়েছেন সেটা আমাদের মেনে চলতে হবে। কাজেই ডিসি এসপিরা তাদের কাজের সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে বাগানগুলো তদারকি করবেন।”

“মূল কথা হল বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহারে মানুষের যাতে কোন ক্ষতি না হয় সেটি খেয়াল রাখা। আমরা সেটাই করছি”, বলছিলেন ডিআইজি হাফিজ আক্তার।

রাজশাহীর জেলা প্রশাসক এসএম আব্দুল কাদের বলেন, “আম বড় হতে এখনো অনেক সময় লাগবে। তবে এখন থেকেই আমবাগানগুলো নিয়মিতভাবে তদারকির জন্য প্রত্যেক উপজেলায় একাধিক ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হয়েছে এবং তারা কাজ শুরু করেছেন।”

রাজশাহী শহরের উত্তর প্রান্তে শেখপাড়া এলাকায় শত বছরের পুরনো কয়েকটি  আমবাগান রয়েছে। গত বুধবার সেখানকার একটি বাগানে গিয়ে দেখা গেল, স্প্রে মেশিন ব্যবহার করে একজন আম চাষি তার নতুন পুরনো আমগাছগুলিতে কীটনাশক ছিটাচ্ছেন।

কারণ জানতে চাইলে বললেন যে এবার আমে ‘মহা’ (মড়ক) লেগেছে। এমনিতেই আমের ফলন ভালো না, বাগানের অধিকাংশ গাছেই ফল ধরেনি। তার ওপর মহার কারণে গাছে আম থাকছে না, ঝরে পরছে। মহা থেকে আম রক্ষা করার জন্য তিনি মরিয়া হয়ে উঠেছেন।

“আমে মুকুল আসার সময় হয়েছে বৃষ্টি। শীত তো ছিলই না, বরং বৃষ্টিতে সব কুয়াশা কেটে গেছে। এখন ফল যখন গুটি থেকে বড় হচ্ছে তখন শুরু হয়েছে ঝড়-বাদল, শিলা বৃষ্টি। একের পর এক আম ঝরে পড়ছে, ফেটে যাচ্ছে, পোকা লাগছে, আম ফুটো হয়ে যাচ্ছে, কালো দাগ হচ্ছে”, বলছিলেন শেখপাড়ার আম চাষি আব্দুল জব্বার।

আব্দুল জব্বার কীটনাশক হিসেবে ব্যবহার করছিলেন টিটট্রো, যেটা ক্লোরপাইরিফস ও সাইপারমেথ্রিনের একটি মিশ্রণ। মোড়কেই লিখা রয়েছে যে এর স্বাদ গন্ধ নেওয়া, শরীরে লাগানো বা পানাহারের সময় ব্যবহার নিষেধ এবং এটি ব্যবহারের জমি থেকে উৎপাদিত ফসল ১৪ থেকে ২১ দিনের মধ্যে খাওয়া যাবে না।

“খারাপ আবহাওয়া আর পোকার আক্রমণ থেকে আম বাঁচানোর জন্যে কীটনাশক ব্যবহার করতে হচ্ছে। কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী আমরা এটা ব্যবহার করছি”, বলেন তিনি।

তিনি জানান যে হাইকোর্টের নির্দেশনার পর তারা অস্বস্তিতে পরেছেন। বলেন, “বাগানে বারবার পুলিশ আসছে, প্রশাসনের লোকরা আসছে, কিন্তু আমরা কাউকেই বোঝাতে পারছি না যে আমাদের কাছে কীটনাশক ছাড়া পোকা দমন ও খারাপ আবহাওয়া থেকে আম রক্ষার অন্য উপায় নেই।”

শেখপাড়ার প্রায় ৭০ বিঘা জমির উপর বিস্তৃত একটি আমবাগানের একাংশ তদারকি করেন মো. আলাউদ্দিন। দেখাশোনা করার জন্য বাগানের এক কোনায় তিনি মাচা বানিয়েছেন, বিস্কুট রুটির একটি দোকানও দিয়েছেন। দোকান চালান, পাশাপাশি বাগানে খেয়াল রাখেন। তিনি বলেন, “এবার ভালো জাতের গাছে ফল খুব কম। দুইশ গাছে প্রতি বছর বারশ-তেরশ মন আম হয়। গোপালভোগ, ক্ষীরশাপাত, ল্যাংড়া জাতের বেশিরভাগ গাছে এবার নতুন পাতা বের হয়েছে, মানে ওসব গাছে এবার ফল হবে না।”

ফলনের খারাপ পরিস্থিতি দেখে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এ বছর আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা গত বছরের তুলনায় বৃদ্ধি করেনি বরং সমপরিমাণ নির্ধারণ করেছে।

অধিদপ্তরের হিসেব অনুযায়ী গত অর্থবছর এ অঞ্চলের চার জেলা- চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর ও নওগাঁয় ৭০,৩৬১ হেক্টর জমি থেকে আম উৎপাদন হয়েছিল ৮,৬৬,৩৬১ টন। তাদের হিসেব অনুযায়ী প্রতি বছরই আম চাষের জমি ও ফলন আগের বছরের তুলনায় বৃদ্ধি পায়। যেমন ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৬৬,৩০০ হেক্টর জমি থেকে আম উৎপাদন হয়েছিল ৭,৫৬,৮৪৯ টন। আবার ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৫৭,৮৬৪ হেক্টর জমি থেকে আম হয়েছিল ৬,৪২,১৮৩ টন।

“ফাল্গুনে আমের মুকুল আসার সময় বৃষ্টি হওয়ায় অনেক মুকুল ঝরে পরেছে। পরে ঝড় শিলাবৃষ্টিতেও ক্ষতি হয়েছে। তবে আমরা গতবছরের সমপরিমাণ ফলন আশা করছি। ঝড়-বাদল বেশী হলে তখন ফলন কমার আশংকা থাকে”, বলছিলেন দেব দুলাল ঢালী।

শেখপাড়ার আরেকজন আম চাষি শাকের আলী বলেন, “চাষি পর্যায়ে আম গাছে যথেচ্ছ রাসায়নিকের ব্যবহার এ অঞ্চলে হয়না। ফলে বিষের কারণে কোন মানুষের ক্ষতি হোক এটা আমরা কখনই চাই না। এই আম তো আমরা নিজেরাও খাই। তবে আমাদের কাছে আম কিনে ব্যবসায়ীরা কি করেন তা আমাদের জানা নেই।”

স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, “রাজশাহীর আমে বিষ প্রয়োগের বিষয়টি এক সময় বেশ আলোচিত ছিল। তবে ২০১৫ সালে এ অঞ্চলের আম রপ্তানি শুরু হওয়ার পর চাষি ও ব্যবসায়ী দুই পর্যায়েই এ প্রবণতা কমতে শুরু করেছে। তবে এখনো যারা রাসায়নিক ব্যবহার করছেন, তাদের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য পৃথক কর্মসূচি গ্রহণ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”

 

https://www.thedailystar.net/

Read 330 times

Leave a comment

Make sure you enter the (*) required information where indicated. HTML code is not allowed.