x 
Empty Product
Saturday, 23 February 2019 18:03

আমের ভাল ফলন নিশ্চিত করতে এ সময়ে করণীয়

Written by 
Rate this item
(0 votes)

বাংলাদেশে আম হল ফলের রাজা এবং গাছ হল জাতীয় গাছ। আম সাধারনত উষ্ণ ও অবউষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের স্বার্থকভাবে জন্মে। ইন্দো-র্বামা অঞ্চলে আমের উৎপত্তিস্থল বলে ধারণা করা হয় তবে বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহামহাদেশে আম সবচেয়ে জনপ্রিয় ফল কারন এ ফল বৈচিএ্যপূর্ণ ব্যবহার, পুষ্টিমান ও স্বাদে-গন্বেধ অতুলনীয়। বাংলাদেশে প্রায় সব অঞ্চলে আম জন্মে কিন্তু দেশের উত্তরাঞ্চলে এর বানিজ্যিকভাবে ব্যাপক চাষ হয়ে থাকে। আম চাষীরা প্রতি বছর অনেক ক্ষতির শিকার হয়ে থাকেন সাধারনত দুই প্রকারের সমস্যার কারনে যথা ঃ (অ) প্রাকৃতিক কারন (যেমন- ঝড়, শিলাবৃষ্টি, খরা প্রভৃতি) এবং (আ) রোগ ও পোকামাকড় দ্বারা আক্রান্ত হয়ে। সঠিক পরিচর্চা ও রোগ-পোকামাকড় দমন করে প্রথম ক্ষতি আংশিক এবং দ্বিতীয় ক্ষতি প্রায় সম্পূর্ণ রুপে সমাধান করা সম্ভব। নীচে ইহা পর্যায়ক্রমে আলোচনা করা হল ঃ-
(অ) ফলন্ত আম গাছের পরিচর্চা ঃ আম গাছের ফল ধারন ক্ষমতা বৃদ্বি এবং ফলন বাড়ানোর জন্য নিম্নলিখিত পরিচর্চাগুলি করা একান্ত প্রয়োজন।

পরগাছা দমন ঃ আমগাছে একাধিক জাতের আগাছা জন্মাতে দেখা যায় যা গাছের স্বাভাবিক বৃদ্বি ও স্বাস্থ্যের প্রতি ক্ষতিকর। পরগাছাসমুহে শিকড়ের মত এক প্রকার হষ্টোরিয়া হয় যা গাছের মধ্যে প্রবেশ করে রস শোষন করে খায় এবং দুর্বল করে। পরগাছার পাদুর্ভাব বেশী হলে গাছের পাতার আকার ছোট হয় ও ফ্যাকাসে হয় এবং অনেক সময় গাছ মারা যায়। এর ফলে গাছের ফলন মারাক্তক ভাবে কমে যায়। তাই ভাল ফলন পেতে হলে অবশ্যই পরগাছা অপসারন করতে হবে।
সার প্রয়োগ ঃ গাছের বৃদ্বি ও ফল উৎপাদনের জন্য সারের ব্যবহার একান্ত প্রয়োজন। ফলন্ত গাছের আকার, বয়স ও মাটির উর্বরতার উপর সারের পরিমান নির্ভর করে। দুপুর বেলা যতটুকু স্থানে ছায়া পড়ে সেটুকু স্থানে মাটি কুপিয়ে সার মাটির সাথে মিশে দিতে হবে।
সেচ প্রয়োগ ঃ সাধারনত জমির উপর স্তরে প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান থাকে বা সার হিসাবে মাটিতে মিশে দেয়া হয় তাই আম বাগানের উপরের ২-৩ মিটার অংশকে জমির পানি সংরক্ষনণ স্তর হিসাবে ধরা হয়। তাই শুস্ক মৌসুমে আম বাগানে পানি সেচ দেয়া দরকার। আমের গুটি মটর দানারমত হওয়ার পর থেকে ১৫-২০ দিন পর পর ২-৩ বার সেচ দিলে আমের গুটি ঝরা বন্বদ হয়।
বয়স্ক টক আমগাছকে মিষ্টি আমগাছে রূপান্তরকরণ ঃ বাগানের কোন গাছের আমের গুনাগুন খারাপ হলে সে গাছকে নষ্ট না করে ভিনিয়ার কলমের মাধ্যমে উন্নতি সাধন করা য়ায়। বয়স্ক গাছের ২-৩ টি ডাল কেটে দিলে সেখান থেকে ন’তন শাখা বের হলে তার পর নতুন শাখাতে ভিনিয়ার কলম করে নিতে হবে। এ ভাবে ৩-৪ বারে কাজ সম্পন্ন করতে হবে।
পুরাতন বাগান নবায়ন ঃ আম বাগানের বয়স বেশী হলে ফল ধারণ কমে যায়, তাই এ ক্ষেতে গাছ কেটে না ফেলে পুরাতন গাছের ভারী শাখা কেটে দিলে সেখানে ন’তন শাখা বের হবে এবং গাছ নবায়ন হয়ে যাবে। এ ভাবে ২-৩ বছরে বাগান নবায়ন করা যায়।

ফসল সংগ্রহ ঃ ফল ধরার ৩-৫ মাসের মধ্যেই জাত ভেদে ফল পাকা শুরু করে। বানিজ্যিক ভাবে কখনো সম্পুন্ন পাকা ভাবে আম গাছ থেকে পাড়া ঠিক নয়। গাছের ফল দুই চারটি পাকা শুরু করলে বাঁশের কোটার মাথায় থলে সদৃশ্য জালতি লাগিয়ে আম পাড়তে হবে যেন আঘাত না লাগে। গাছের নীচে সাময়িক ভাবে রাখতে হলে খড় বিছিয়ে তার উপর রাখতে হবে। নিম্নোক্ত লক্ষণ দেখে ফল সংগ্রহ করতে হবে ঃ- (১) আমের বোটার নীচে হলুদ বর্ণ ধারণ করবে। (২) পানিতে দিলে ডুবে যাবে। (৩) কস বের হলে দুত শুকে যাবে। (৪) দুই একটি পাকা আম গাছ থেকে ঝরে পড়বে।
ফল সংরক্ষণ ঃ আম পচনশীল ফল। বেশী পাকা অবস্থায় সংগ্রহ করলে সংরক্ষণকাল কম হয়। অধিকাংশ জাতের আম ১৩-১৭ ডিগ্রী সে. তাপমাএায় ও ৮৫-৯০% আপেক্ষিক আদ্রতায় বাঁশের ঝুড়ি, বাস্কেট, খড়বিছানো প্রভৃতিতে স্থানে ৪-৭ সপ্তাহ সংরক্ষণ করা যায়।
(আ) রোগ দমন ঃ
অ্যানথ্রাাকনোজ (Anthracnose)

এ রোগ আমের পাতা ও ফলে হয়ে থাকে। ইহা কোলিটোর্টিকাম– গোলেসপোরিওডিস (Colletotrichum gloeosporioides) নামক এক প্রকার ছএাক দ্বারা হযে থাকে। এ রোগের কারনে আমের ফলন শুন্যের কাছাকাছি আসতে পারে।
লক্ষণসমুহ ঃ (১) এ রোগ নুতন পাতা, পুষ্প মঞ্জরী ও ফলে দেখা যায়। (২) পাতায় ধুসর-বাদামী ছোট কৌষিক দাগ পড়ে এবং পরে সমস্ত পাতায় ছড়িয়ে পড়ে ও এক পর্যায় পাতা ঝরে পড়ে। (৩) ফলের উপর প্রথমে গাঢ় বাদামী দাগ পড়ে। (৪) দাগগুলি পরে বড় হয়ে কাল বর্ণ দারন করে। (৫) আক্রমন মারাক্তক হলে পরবতীতে সম্পুর্ণ আম পচে যায়।
অনূকুল অবস্থা ঃ (১) তাপমাএা ২৫-২৮ ডিগ্রী সে.। (২) আপেক্ষিক আদ্রতা ৭০-৮০%। (৩)অধিক বৃষ্টিপাত। (৪) ঘন কুয়াশা ও আকাশ মেঘাছন এ রোগের প্রকোপ বাড়ায়।
দমন ব্যবস্থা ঃ (১) ফল সংগ্রহের পর বাগানের অবশিটাংশ ধংস করতে হবে। (২) স্বাস্থ্যবান গাছ রোপন করতে হবে। (৩) বোর্দো মিশ্র সার ০.৩% হারে ৩-৪ বার স্প্রে করতে হবে (ফুল ধরার পূর্বে ও পরে এবং ফল সংগ্রহের পূর্বে)। (৪) বাভিসটিন ডব্লিউ/পি ০.২ % হারে অথবা ডাইথেন-এম ০.৩ % হারে দুই বার (ফুল ধরার পুর্বে ও পরে ) স্প্রে করতে হবে।

আমের বোটা ও ফল পচা (Stem end rot)

রোগের কারণ ঃ এ রোগ বোর্টিডিপ্লডিয়া থিয়োবোরমি  (Botryodiplodia theobromae) নামক এক প্রকার ছাএাক দ্বারা হয়ে থাকে। এ রোগ আমের বোটা ও ফলে হয়ে থাকে।
রোগের লক্ষনসমুহ ঃ (১) প্রথমে বোঁটার চতুর্দিকে কিছু জায়গা জুড়ে কাল দাগ পড়ে। (২) পরবর্তীতে আমের অধিকাংশ ও সর্বশেষ অংশ পচে কাল রং ধারন। (৩) আক্রান্ত স্থানে চাপ দিলে ভিতর থেকে পচা কাল গন্বধযুক্ত আমের রস বের হয়ে আসে।
রোগ দমন ঃ ক) যে কোন একটি পদ্বতিতে রোগ দমন করবেন ঃ(১) ডাইথেন-এম-৪৫, ০.৩ % হারে ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে। (২) রিডোমিল ০.১ % হারে ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে। (৩),রোভরাল ০.১ % হারে ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে। (খ) আম হারভেষ্ট করার পর ৪৩ ডিগ্রী সে. তাপমাএায় ৫ মিনিট ৬% বোরাক্্র দ্রবনে চুবাতে হবে। (গ) ফল সংগ্রহ করার পর ডালপালা, অবশিষ্টাংশ ধংস করতে হবে।

আমের পাউডারি মিলডিউ (Powdery mildew of mango)

রোগের কারণ ঃ এ রোগ ওডিয়াম মেংগিফেরা  (Oidium mangiferae) নামক ছাএাক দ্বারা হয়ে থাকে।
রোগের লক্ষনসমুহ ঃ (১) পুষ্প মঞ্জরী ও উহার সংলগ্ন কচিপাতা এবং ছোট ফলের উপর সাদা-ধুসর পাউডার দেখা যায়। (২) সাধারনত সংক্রামন পুষ্প মঞ্জরী অগ্রভাগ ক্ষত শুরু করে নীচের দিকে ধাবিত হয় এবং কুচকে যেয়ে ডাই-বেক লক্ষন প্রকাশ পায়। (৩) ফল অপরিপক্ক অবস্থায় ঝরে পড়ে এবং বিকৃত ও বিবর্ণ হয়।
দমন ব্যবস্থা ঃ (১) আমের বাগান পরিষ্কার পরিছিন্ন রাখতে হবে। (২) ছএাকের গঠন ধংস করতে মাঝে মাঝে গাছে পানি স্প্রে করতে হবে। (৩) থিয়োভিট ০.৩ %হারে ফুল ফোটার পূর্বে এক বার ও পরে দুই বার স্প্রে করতে হবে। (৪) ম্যালাথিয়ন ০.২ % হারে ফুল ফোটার পর একবার ও গুটি আসার পর ১৫ দিন পর পর দুই বার স্প্রে করতে হবে।

(ই) পোকামাকড় দমন ঃ
আমের শোষক পোকা/ আমের হপার (Mango hopper)

এই পোকার তিনটি প্রজাতি ক্ষতি করে থাকে। নিম্মে ক্ষতির প্রকৃতি ও দমন ব্যবস্থা দেয়া হল।
ক্ষতির প্রকৃতি ঃআমের অনিষ্টকারী পোকার মধ্যে এ পোকা সব চেয়ে বেশী ক্ষতিসাধন করে থাকে। আমের পাতা ও বোটায় এরা ডিম পাড়ে। এজন্য আক্রান্ত পাতা ও ফুল শুকিয়ে যায় এবং গুটি আসার পূর্বেই ফুল ঝরে য়ায়। এতে ফলন মারাত্থকভাবে কমে যায়। এ পোকার আক্রমনের অন্যতম লক্ষণ হল, আক্রান্ত গাছের নীচে দিয়ে হাঁটলে পোকা লাফিয়ে গায়ে পড়ে।
দমন ব্যবস্থা ঃ এ পোকা দমন করতে হলে মুকুল আসার আগে অথবা মুকুল আসার মুহুর্ত থেকে নিম্নলিখিত কীটনাশক স্প্রেকরতে হবে ঃ ডায়াজিনন ৬০ ইসি বা লেবাসিড ৫০ ইসি চা চামুচের ৪ চামুচ ৮.৫ লিটার পানিতে মিশিয়ে ১৫ দিন পর পর দুই বার স্প্রে করতে হবে। অথবা ম্যালাথিয়ন বা এম.এস.টি ৫৭ ইসি উপরোক্ত মাএায় স্প্রে করতে হবে।

ফলের মাছি বা আমের মাছি পোকা (Mango fruit fly)
ক্ষতির প্রকৃতি ঃ এ পোকার কীড়া পাকা আমের মধ্যে প্রবেশ করে শাঁস খেয়ে ফেলে। এতে ফল পচে যায় ও ঝরে পড়ে। আক্রান্তআম কাটলে অসংখ্য পোকা দেখা য়ায়। পোকার আক্রমন বেশী হলে গাছের সমস্ত আম খাওয়ার অনুউপযোগী হয়ে যায়।
দমন ব্যবস্থা ঃ আম পাকার পূর্বে যখন পূর্ন বৃদ্বিপ্রাপ্ত হয় ডিপটেরেক্্র চা চামুচের ৪ চামচ ৮.৫ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৭ দিন পর পর দুই বার স্প্রে করতে হবে। অথবা ডায়াজিনন ৫০ ইসি ২মিলি/লিটার পানিতে মিশে ফলে স্প্রে করতে হবে ( উক্ত সময়ে ফল খাওয়া যাবে না)।

আমের বিছা পোকা (Mango defoliator)
ক্ষতির প্রকৃতি ঃ এ পোকার কীড়া আম গাছের পাতা খেয়ে ফেলে। আক্রমনের মাএা বেশী হলে গাছ পএ শূন্য হয়ে যায় এবং ফুল-ফল হয় না বা হলেও ঝরে পড়ে। তবে কোন গাছ একবার আক্রান্ত হলে বার বার আক্রান্ত হওয়ার সম্ভনা থাকে।
দমন ব্যবস্থা ঃ আক্রান্ত গাছে ডাইমেক্রম ১০০ ইসি ৩০০ মিলি বা ডায়াজিনন ৫০ ইসি ৪০০ মিলি বা সুমিথিয়ন ৫০ ইসি ৪৫৪ মিলি ২২৫ লিটার পানিতে মিশেয়ে স্প্রে করতে হবে।


Read 212 times

Leave a comment

Make sure you enter the (*) required information where indicated. HTML code is not allowed.