x 
Empty Product
Friday, 22 February 2019 19:36

আমের ফলন বৃদ্ধির কৌশল

Written by 
Rate this item
(0 votes)

বাংলাদেশে উৎপাদিত ফলের মধ্যে আমের স্থান দ্বিতীয়। পছন্দের দিক থেকে সবচেয়ে প্রিয় ফল হলো আম। স্বাদে-গন্ধে, পুষ্টিগুণের বিচারে আমের সঙ্গে অন্য ফলের তুলনা হয় না। তাই বিখ্যাত উদ্যানবিদ পোপেনো আমকে ফলের রাজা হিসেবে অভিহিত করেছেন। পাকা আমে যথেষ্ট পরিমাণে ক্যারোটিন বা ভিটামিন 'এ' এবং খনিজ পদার্থ আছে। কাঁচা আমে ভিটামিন 'সি' ও লোহা থাকে। প্রতি ১০০ ভাগ পাকা আমের মধ্যে ০.৫ ভাগ প্রোটিন, ০.১ ভাগ ফ্যাট, ০.৫ ভাগ খনিজ পদার্থ, ১১.৯ ভাগ কার্বোহাইড্রেট, ০.১ ভাগ ক্যালসিয়াম, ০.০২ ভাগ ফসফরাস, ০.৩ ভাগ লোহা ও প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন এ, বি, ও সি আছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভাগের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০০৮-০৯ সালে ভারতে ১৩.৬, চীনে ৪.২, থাইল্যান্ডে ২.৫, মেঙ্েিকাতে ১.৯, পাকিস্তানে ১.৮ ও ব্রাজিলে ১.২ মিলিয়ন টন আম উৎপন্ন হয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার অন্য এক তথ্য থেকে জানা যায়, পৃথিবীর ১০টি শীর্ষ আম উৎপাদনকারী দেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্থান অষ্টম। বাংলাদেশে প্রতি বছর ৮ লাখ ৮৯ হাজার ১৭৬ মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জেই উৎপাদিত হয় ২ লাখ টন। দেশে মাথাপিছু গড় আম উৎপাদন মাত্র ৪.৮ কেজি। ভারত ও পাকিস্তানে মাথাপিছু গড় উৎপাদন যথাক্রমে ১২ ও ৭ কেজি। ষাটের দশকেও বাংলাদেশে মাথাপিছু গড় উৎপাদন ছিল ৫ কেজির মতো। বিশ্বে মোট উৎপাদিত আমের শতকরা ৫০ ভাগ উৎপাদিত হয় ভারতে। ভারতে বছরে ১ কোটি ৫১ লাখ ৮৮ হাজার টন আম উৎপাদিত হয়। ভারতে হেক্টরপ্রতি আমের গড় ফলন ৮ থেকে ১০ টন। আর বাংলাদেশে হেক্টরপ্রতি আমের গড় ফলন ৪.৭০ টন। ২০ বছর আগেও বাংলাদেশে হেক্টরপ্রতি আমের গড় ফলন ছিল ৮.৮ টন। বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশে হেক্টরপ্রতি আমের ফলন কম হয়। কারণগুলো হলো_ এক. ভালো জাতের অভাব। দুই. অঙ্গজ ছাঁটাই না করা। তিন. সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ না করা। চার. সময় মতো সেচ না দেয়া। পাঁচ. পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণ। ছয়. হরমোনের ভারসাম্যহীনতা ইত্যাদি।

ভালো জাতের অভাব :- বাংলাদেশে অনেক জাতের আমের চাষ হয়। তবে ভালো জাতের আমের চাষ দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলেই সীমাবন্ধ। অনেকের মতে, উপযুক্ত যত্ন নিলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও ভালো জাতের আমের চাষ করা সম্ভব। দেশে বাণিজ্যিকভিত্তিতে যেসব আমের চাষ করা হয় তার মধ্যে ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, খীরসাপাতি, আশ্বিনা, সূর্যপুরী, হিমসাগর, কিষাণভোগ, হাঁড়িভাঙ্গা, মোহনভোগ, কোহিতুর, লক্ষণভোগ, বোম্বাই, লতা বোম্বাই, বারিআম-১ (মহানন্দা), বারিআম-২, বারিআম-৩ (আম্রপালি), বারিআম-৪, বারিআম-৫, বারিআম-৬, বারিআম-৭, বারিআম-৮ ও বারিআম-৯ (কাঁচামিঠা) ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

অঙ্গজ ছাঁটাই :- সম্প্রতি ভারতের এক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, ফল সংগ্রহের পর আম গাছের ডাল সামান্য ছাঁটাই করে দিলে প্রতি বছর ফল না আসার সমস্যা অনেকটা লাঘব হয়। আম গাছে প্রতি বছর ডাল ছাঁটাইয়ের প্রয়োজন হয় না। তবে যেসব ডাল রোগাক্রান্ত বা শুকিয়ে গেছে সেসব ডালপালাই শুধু কেটে ফেলতে হবে।

সার প্রয়োগ :- আম গাছের সুষ্ঠু বৃদ্ধি, ফুল ও ফলের জন্য নিয়মিত সার প্রয়োগ প্রয়োজন। গাছের আকার, বয়স ও মাটির উর্বরতার ওপর সারের পরিমাণ নির্ভর করে। ভালো ফলনের জন্য বছরে দু'বার আম গাছে সার প্রয়োগ করতে হবে। প্রথমবার জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে দু'এক পশলা বৃষ্টির পর, দ্বিতীয়বার বর্ষা মৌসুম শেষে আশ্বিন মাসে। একটি পূর্ণবয়স্ক ফলন্ত গাছে বছরে দুই কিস্তিতে ৫০ কেজি জৈব সার, ২ কেজি ইউরিয়া, এক কেজি টিএসপি, ৫০০ গ্রাম এমওপি, ৫০০ গ্রাম জিপসাম, ২৫ গ্রাম জিংক সালফেট প্রয়োগ করতে হবে। দুপুরে যতটুকু স্থানে গাছের ছায়া পড়ে সে স্থানে সার প্রয়োগ করে উত্তমরূপে কুপিয়ে মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে।

সেচ প্রয়োগ :- মাটিতে রসের অভাব হলে আমের গুটি ঝরে যেতে পারে। মার্চ-এপ্রিল মাসে বৃষ্টিপাত না হলে মাটিতে রসের অভাব দেখা দেয়। এ ক্ষেত্রে আম মটরদানার মতো হলে একবার এবং মার্বেলের মতো হলে আরেকবার বাগানে সেচ দিতে হবে। সেচের ব্যবস্থা না থাকলে পানি স্প্রে করেও আমের গুটি ঝরানো অনেকটা কমানো যায়।

পোকামাকড় ও রোগবালাই দমন :- জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি মাসে আম গাছে মুকুল আসে। মুকুল আসার পর আম ঝরে যাওয়ার একটি প্রধান কারণ হলো হপার বা শোষক পোকার আক্রমণ। শোষক পোকার বাচ্চা ও পূর্ণবয়স্ক পোকা আম গাছের রস চুষে আম গাছের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে থাকে। এ পোকা দু'ভাবে আমের ক্ষতি করে_ পাতা ও ফুলের বোঁটায় ডিম পাড়ার ফলে আক্রান্ত পাতা ও ফুল শুকিয়ে গুটি আসার আগেই মুকুল ঝরে যায়। পূর্ণবয়স্ক ও বাচ্চা পোকা মুকুল ও কচি পাতার রস খায়। ফলে মুকুল ঝরে পড়ে এবং গাছ দুর্বল হয়ে যায়। এ ছাড়া পোকার দেহ থেকে পাতা ও মুকুলের ওপর এক ধরনের মিষ্টি রস নিঃসৃত হয় এবং রস নিঃসৃত স্থানে এক ধরনের কালো ছত্রাক জন্মে। ফলে মুকুল ঝরে আমের ফলন ব্যাপক হ্রাস পায়। হপারের আক্রমণে আমের ফলন শতকরা ২০ থেকে ১০০ ভাগ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে। আমের শোষক পোকা দমনের জন্য মুকুল আসার ১০ দিনের মধ্যে একবার এবং এর এক মাস পর আরেকবার প্রতি লিটার পানির সঙ্গে এক মিলি. সাইপারমেথ্রিন জাতীয় কীটনাশক (যেমন_ রিপকর্ড, সিমবুশ, বাসাথ্রিন, উস্তাদ, রেলেথ্রিন, ম্যাজিক, বুস্টার) মিশিয়ে আম গাছের কা-, ডাল, পাতা ও মুকুল ভালোভাবে ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে। ছাতরা পোকার আক্রমণেও আমের মুকুল ঝরে পড়তে পারে। এ পোকা দমনের জন্য ইমিডাক্লোপ্রিড জাতীয় কীটনাশক (হেমিডর/কনফিডর) দুই গ্রাম ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে আম গাছে ৭ দিন পরপর দু'বার স্প্রে করতে হবে। আমের মুকুলে ও কচি আমে এনথ্রাকনোজ ও পাউডারি মিলডিউয়ের আক্রমণ দেখা দিলেও কচি আম ঝরে যেতে পারে। এনথ্রাকনোজ রোগের আক্রমণে গাছের পাতা, কা-, মুকুল ও ফলে ধূসর বাদামি রঙের দাগ দেখা যায়। আমের গায়ে কালচে দাগ পড়ে এবং আম পচে যায়। কুয়াশা, মেঘাচ্ছন্ন ও ভেজা আবহাওয়ায় এ রোগ ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে এবং সব মুকুল ঝরে পড়ে। এ রোগ দমনের জন্য গাছে মুকুল আসার পর, ফুল ফোটার আগে টিল্ট-২৫০ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি অথবা ডাইথেন এম-৪৫ দুই গ্রাম প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। আমের আকার মটরদানার মতো হলে দ্বিতীয়বার স্প্রে করতে হবে। পাউডারি মিলডিউ রোগের আক্রমণে আমের মুকুলে সাদা পাউডারের মতো আবরণ দেখা যায়। আক্রান্ত আমের চামড়া খসকসে হয় এবং কুঁচকে যায়। এ রোগ দমনের জন্য গাছে মুকুল আসার পর একবার এবং ফল মটরদানার মতো হলে আর একবার প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম থিওভিট অথবা টিল্ট-২৫০ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি. হারে মিশিয়ে ভালোভাবে স্প্রে করতে হবে। প্রয়োজনে একই মেশিনে কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক একসঙ্গে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

হরমোন স্প্রে :- গাছের অভ্যন্তরে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা দেখা দিলে কচি আম ঝরে পড়তে পারে। তাই প্রতিশেধক ব্যবস্থা হিসেবে আম মটরদানার মতো হলে ন্যাপথলিন অ্যাসিডিক এসিড যুক্ত হরমোন যেমন_ প্লানোফিঙ্ ৪.৫ লিটার পানিতে ২ মিলি. বা মিরাকুলান ১০ লিটার পানিতে ৫ মিলি. হারে মিশিয়ে আম গাছে স্প্রে করতে হবে। আম মটরদানার মতো হলে একই হরমোন একই মাত্রায় আরেকবার স্প্রে করতে হবে। যমুনা নদীর পূর্বদিকে অবস্থিত বাংলাদেশের সব জেলায় আমের সবচেয়ে ক্ষতিকারক পোকা হলো ভোমরা পোকা। এ পোকা আমের গায়ে ছিদ্র করে ভেতরে ঢুকে শাঁস খায়। সাধারণত কচি আমে ছিদ্র করে এরা ভেতরে ঢুকে এবং ফল বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছিদ্রটি বন্ধ করে দেয়। এ জন্য বাইরে থেকে আমটি ভালো মনে হলেও ভেতরে পোকা পাওয়া যায়। একবার কোনো গাছে এ পোকার আক্রমণ হলে প্রতি বছরই সে গাছে আক্রমণ হয়ে থাকে। এ পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে হলে আম গাছের মরা ও অতিরিক্ত পাতা, শাখা এবং পরগাছা কেটে ফেলতে হবে। রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করে উইভিল দমন কারর জন্য গাছে ফল আসার এক থেকে দুই সপ্তাহ পর প্রতি লিটার পানিতে ২ মিলি. হারে সুমিথিয়ন ৫০ ইসি বা ডায়াজিনন ৬০ ইসি মিশিয়ে আম গাছের কা-, ডাল, পাতা ও আম গাছে ভালোভাবে ১৫ দিন পরপর দু'বার স্প্রে করতে হবে।

Read 324 times

Leave a comment

Make sure you enter the (*) required information where indicated. HTML code is not allowed.